তারিখের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশিরা বিশ্বের ১৭২টি দেশে কর্মরত। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান, যাদের বেশিরভাগই শ্রম ভিসায়। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ২০২২ সালের রিপোর্ট মতে প্রায় ৫ মিলিয়ন প্রবাসী রয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে ২০২৪ সালে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে। ২ জুলাই, ২০২৪ ডেইলি স্টার-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গড়ে একজন প্রবাসী বছরে ৩২০০-৩৫০০ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন, যা প্রতি মাসে প্রায় ২৫০-৩০০ ডলার বা ৩০-৩৫ হাজার টাকা। একজন প্রবাসী তার উপার্জিত টাকার ৪০-৫০% বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আকারে পাঠিয়ে থাকেন। তার মানে গড়ে তার প্রতি মাসে আয় ৫০-৭০ হাজার টাকা। তবে এটি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে, বিশেষ করে আমাদের ইম্পোর্ট বেইজড অর্থনীতিতে। বণিক বার্তা ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে আরও চাপে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বহির্বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বলতে প্রধানত দেশের আমদানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বিদেশি ঋণ, বিনিয়োগ ও সহায়তাকে বোঝায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমানে রেমিট্যান্স ছাড়া সব ক'টি খাতই ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। এছাড়া ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ পরিস্থিতি বাধাগ্রস্ত হওয়া, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং আর্থিক খাতে অস্থিরতা তো রয়েছেই। গত কয়েক বছরে রেমিট্যান্স বাড়াতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসীদের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার উদ্যোগকে আরও জোরালো করার ব্যাপারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদগণ বার বার বলে আসছেন।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এই জনশক্তির বেশিরভাগ অংশ নির্মাণশিল্প, গৃহ পরিচর্যাকারী, কৃষি ও অন্যান্য শ্রমভিত্তিক পেশায় নিযুক্ত। যদিও এতে আমাদের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তবে যদি আমরা তথ্য প্রযুক্তিতে (আইসিটি) দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির দিকে মনোযোগ দিই, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কেমন হতে পারে?
একটি ভিন্ন গল্প কল্পনা করা যাক
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) চাকরির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আইসিটি মানে শুধু আইসিটি বিশেষজ্ঞ নন, তথ্য প্রযুক্তিতে খুবই স্পেসিফিক স্কিলড জনশক্তির সারা বিশ্বব্যাপী চাহিদা আছে। যদি আমরা প্রতি বছর ২০ লাখ দক্ষ আইসিটি পেশাদার তৈরি করতে পারি এবং তাদের মাসিক গড় আয় কমপক্ষে ৩-৫ লাখ টাকা হয়, তাহলে তাদের আয় থেকে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসতে পারে। যদি এই জনশক্তি তাদের উপার্জনের মাত্র ৪০% দেশে পাঠায়, তাহলে বছরে বাংলাদেশ ৭৫ থেকে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করতে সক্ষম হবে। ৫ বছরের মধ্যেই এই আইসিটি দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
এখানে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিকে যদি আমরা তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে সঠিক পরিকল্পনা নিতে পারি, তাহলে কেমন হয়?
প্রশ্ন আসতে পারে কেন আইসিটি জনশক্তি রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ? নিচে প্রধান ৫টি কারণ আমার মতে বেশি উল্লেখযোগ্য:
- ১. বৈশ্বিক চাহিদা – বিশ্ববাজারে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, এআই, ব্লকচেইন ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সাথে সাথে ডাটা এন্ট্রি, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, কন্টেন্ট রাইটিং, কপিরাইটিং, ওয়েব রিসার্চ, ট্রান্সক্রিপশন, অনলাইন কাস্টমার সার্ভিস, এসইও স্পেশালিস্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়ার্ডপ্রেস ডেভেলপমেন্ট, ইউজার টেস্টিং, ফাইভার/আপওয়ার্ক প্রোফাইল ম্যানেজমেন্ট, ইমেইল মার্কেটিং, অনলাইন টিউটরিং, অ্যানিমেশন ও মোশন গ্রাফিক্স, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, কাস্টমার রিভিউ ম্যানেজমেন্ট-এর মতো খাতে দক্ষ পেশাজীবীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
- ২. উচ্চ আয় ও জীবনমান উন্নয়ন – প্রচলিত শ্রমশক্তির তুলনায় আইসিটি পেশাদারদের বেতন অনেক বেশি, যা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভজনক।
- ৩. বিকল্প রপ্তানি উৎস তৈরি – প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে বিকল্প রপ্তানি উৎস তৈরির প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
- ৪. বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি – উচ্চমানের প্রযুক্তি দক্ষতার কারণে বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
- ৫. উদ্যোক্তা মনোভাব - তথ্য প্রযুক্তিকেন্দ্রিক উদ্যোগটা মনোভাবে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা।
তাই বাংলাদেশ যদি তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং দেশের সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি বাজারে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং আগামী ৫-১০ বছরে একটি উন্নত ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ২০%-এর বেশি। ২০২৩ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই তরুণদের প্রায় ৩৫%, অর্থাৎ ১.০২ কোটি যুবক বর্তমানে নিষ্ক্রিয়। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইসিটি খাতে শিক্ষাদান করলে এই তরুণদের যথাযথ দক্ষতায় রূপান্তর করা সম্ভব। প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতি কৌশলগত মনোযোগ দিলে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি-নির্ভর শ্রমশক্তি হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করতে পারে।
তথ্য প্রযুক্তি আজকের বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল আলোচিত খাত। আইটি বিপ্লব বিশ্বকে একটি "গ্লোবাল ভিলেজ"-এ রূপান্তর করেছে, যেখানে সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে মুহূর্তেই যোগাযোগ সম্ভব। তবে বাংলাদেশ এখনও এই বিশ্বায়নের প্রকৃত সুবিধা নিতে পারেনি। আমরা ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে গর্বিত হলেও, আমাদের এখনও প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার অনেক কিছু বাকি রয়েছে।
বাংলাদেশকে সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে পরিচিতির পরিবর্তে প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিভা উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের এবং অভিভাবকদের আইসিটি শিক্ষায় সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধুমাত্র হাই-টেক পার্ক, ফ্রিল্যান্সিং হাব বা ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুললেই হবে না; আইসিটি শিক্ষাকে মৌলিক শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিতে হবে, ঠিক যেমন শিশুরা তাদের জীবনের প্রথম শিক্ষায় অ, আ, ক, খ, A (apple), B (ball), C (cat) শেখে, তেমনি তাদের জীবনের প্রথম শিক্ষায় এগুলোর পাশাপাশি শেখাতে হবে (A) অ্যাবাকাস, (B) ব্লুটুথ, (C) কম্পিউটার। এটি সফল করতে শিক্ষক, অভিভাবক, সরকার এবং শিক্ষার্থীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ব্লকচেইন, রোবোটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার সিকিউরিটি, ওয়েব ৩.০ এবং মেশিন লার্নিং-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে— যদি আমরা বিশ্বের জন্য পোশাক তৈরি করতে পারি, তাহলে রোবটও তৈরি করতে পারি। তবে এটি শুধু সেমিনার, ওয়ার্কশপ বা কাগজে-কলমে হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং স্কুলের পাঠ্যক্রমে প্রথম থেকেই সরাসরি হাতে-কলমে রোবোটিক্স ও উন্নত প্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে তারা আইসিটি শিক্ষাকে ভয় না পেয়ে খেলতে খেলতে শিখতে পারে।
আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশ এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগটি প্রথম দিকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও ২০২২ সালে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। প্রথম পর্বেই এটি ২০০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১৮,০০০ শিক্ষার্থীকে সংযুক্ত করেছে। বর্তমানে দ্বিতীয় মৌসুমে এটি প্রায় ৭০,০০০ শিক্ষার্থী, ২,০০০-এর বেশি আইসিটি শিক্ষক, ৩,০০০ আইসিটি অ্যাম্বাসেডর শিক্ষার্থী এবং ১০০টির বেশি আইটি কোম্পানির সমন্বয়ে আরও বৃহৎ পরিসরে কাজ করছে। এই প্ল্যাটফর্মটি ২১টি ভিন্ন আইসিটি সেগমেন্ট নিয়ে কাজ করছে, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে বৈশ্বিক প্রবণতার সাথে মিলিয়ে আনতে সাহায্য করবে। আইসিটি অলিম্পিয়াডের মূল লক্ষ্য শুধু প্রতিযোগিতা, কোর্স বা ইভেন্ট আয়োজন নয়, বরং আইসিটি শিক্ষাকে সর্বস্তরে জনপ্রিয় করা।
আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মোহাম্মদ শাহরিয়ার খান একজন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী। নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি একাধিক টেক স্টার্টআপের সাথেও যুক্ত আছেন। তিনি মনে করেন, আইসিটি হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত, এবং তাই তিনি দেশ-বিদেশে আইসিটি শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন। তার স্বপ্ন— বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রথম দিন থেকেই আইসিটি শিক্ষার সাথে যুক্ত হবে।








০ টি মন্তব্য