কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে নতুন ও জুনিয়র পর্যায়ের প্রযুক্তিকর্মী নিয়োগের হার কমেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এআই এজেন্ট ব্যবহার করে আগের তুলনায় বেশি কোড তৈরি, বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং চুক্তিপত্র প্রক্রিয়াকরণ করতে পারছেন। ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য জানিয়েছে ক্লড এআইয়ের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি।
‘হাউ এমপ্লয়মেন্ট ইজ চেঞ্জিং অ্যাট অ্যানথ্রোপিক’ শীর্ষক গবেষণায় প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্থান, এআই ব্যবহারের তথ্য, উৎপাদনশীলতা, কর্মীদের জরিপ এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৭ জন কর্মীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। গবেষণাটি বলছে, এআইয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন ও কর্মী নিয়োগের চাহিদা বদলে দিচ্ছে।
গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে অ্যানথ্রোপিকের প্রযুক্তি বিভাগে জুনিয়র কর্মীদের অংশ ছিল ২১ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত জুনিয়র প্রযুক্তিকর্মীদের অনুপাত ২৭ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানটি বড় হলেও নতুন পর্যায়ের প্রযুক্তিকর্মী নিয়োগের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমেছে।
এর পেছনে এআইয়ের মাধ্যমে কোড লেখা, সফটওয়্যারের ত্রুটি শনাক্ত এবং নিয়মিত প্রযুক্তিগত কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার সক্ষমতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এক জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মেশিন লার্নিং ব্যবস্থাপক এবং এক-পঞ্চমাংশ সফটওয়্যার প্রকৌশল ব্যবস্থাপক এআইয়ের কারণে কম নিয়োগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে এআই এজেন্ট ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির তথ্যও উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে কর্মীদের নির্দেশনায় পরিচালিত এআই এজেন্টগুলোর কাজের সময় মানব কর্মীদের কর্মঘণ্টার তুলনায় প্রায় ছয় গুণে পৌঁছায়। তবে এ হিসাব এজেন্টের সক্রিয় কাজ ও ব্যবহারের সময়ের ভিত্তিতে করা হয়েছে; একে মানুষের তুলনায় ছয় গুণ বেশি উৎপাদনশীলতার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
কোড তৈরির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। এআই কোডিং এজেন্ট ব্যবহার শুরু করার পর প্রকৌশলীদের কোড জমা দেওয়ার হার বেড়েছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, আইন বিভাগে চুক্তিপত্র পর্যালোচনা, বিক্রয় বিভাগে গ্রাহক ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ বিভাগে চালান প্রক্রিয়াকরণের মতো কাজেও এআই সহায়তা দিচ্ছে। ফলে কর্মীরা নিয়মিত কাজের বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা ও জটিল সমস্যা সমাধানে বেশি সময় দিতে পারছেন।
তবে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও মানুষের প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং এআই এজেন্টের তৈরি ফলাফল যাচাই, তাদের কাজের তদারকি এবং ভুল শনাক্ত করার দায়িত্ব বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের নিয়োগদাতারা এখন নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রার্থীর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ এবং এআই টুল কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় অ্যানথ্রোপিক এআইয়ের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে এমন পদগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য একটি আগাম সতর্কতাব্যবস্থা গড়ে তুলছে। পাশাপাশি কর্মীদের দায়িত্ব পরিবর্তন এবং প্রতিষ্ঠানের অন্য বিভাগে স্থানান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে গবেষণাটিতে স্বীকার করা হয়েছে, এসব উদ্যোগ নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ার সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয়।
বিশ্লেষকদের জন্য এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ফলাফল সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটি একটি এআই-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তুলে ধরে; পুরো বিশ্ব বা বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একই পরিবর্তন ঘটছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। তবু প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, এআই পরিচালনা, বিচারবুদ্ধি এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: অ্যানথ্রোপিকের মূল গবেষণা প্রতিবেদন











০ টি মন্তব্য