বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ভ্রমণতথ্য, ব্যক্তিগত ভ্রমণ মানচিত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রিপ প্ল্যানিং সুবিধা এক জায়গায় এনে তৈরি করা ‘আনসিন বাংলাদেশ’ ওয়েব অ্যাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সফটওয়্যার ডিজাইনার মো. সাব্বির হোসেনের তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন থেকে শুরু হলেও পরে তা বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সাব্বিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সাত দিনে ওয়েব অ্যাপটিতে ২ কোটি ৪০ লাখ ভিজিট হয়েছে এবং ইউনিক ভিজিটরের সংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার।
‘আনসিন বাংলাদেশ’-এর মূল আকর্ষণ হলো ব্যবহারকারীর ভ্রমণকে একটি ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল মানচিত্রে তুলে ধরা। বাংলাদেশের কোন কোন জেলা ভ্রমণ করা হয়েছে, তা এক ক্লিকেই মানচিত্রে দেখা যায়। ব্যবহারকারী নিজের নাম ব্যবহার করে সেই মানচিত্র ডাউনলোডও করতে পারেন। তবে প্ল্যাটফর্মটি শুধু ভ্রমণের হিসাব রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চার-পাঁচটি জেলা নির্বাচন করলে এআই ব্যবহারকারীর জন্য একটি সম্ভাব্য ভ্রমণ পরিকল্পনা সাজিয়ে দিতে পারে। কোথায় আগে যাওয়া যেতে পারে, কোথায় থাকা সুবিধাজনক, কীভাবে যাতায়াত করা যায় এবং সম্ভাব্য খরচ কত হতে পারে—এসব বিষয় পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের বিশেষ দিক হলো, এটি কোনো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি পণ্য নয়। সাব্বির নিজেই এর নকশা ও উন্নয়নের বড় অংশ করেছেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে সফটওয়্যার ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মোবাইল অ্যাপ ও সফটওয়্যার ডিজাইনে তাঁর ছয় বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওয়েব অ্যাপ তৈরির কাজে তিনি এআই টুল ‘ক্লড কোড’ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ একজন প্রযুক্তিপেশাজীবী এআইকে শুধু সহকারী হিসেবে ব্যবহার না করে বাস্তব একটি ডিজিটাল পণ্য তৈরির কাজে কীভাবে কাজে লাগাতে পারেন, প্রকল্পটি তার একটি উদাহরণ।
সাব্বিরের ধারণাটি শুরু হয়েছিল নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে। তিনি বিভিন্ন জেলা ঘুরেছেন এবং প্রথমে নিজের ভ্রমণ করা জায়গাগুলো একটি মানচিত্রে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু নতুন জেলা ভ্রমণ করলে আবার মানচিত্র পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো। সেখান থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তনযোগ্য একটি ওয়েব অ্যাপ তৈরির চিন্তা আসে। পরে প্রকল্পটি আরও বড় হয়। বাংলাদেশের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত স্থানগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরার পরিকল্পনা যুক্ত হয়।
ওয়েব অ্যাপটিতে বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ২৪০টির বেশি দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। কোথায় যাওয়া যায়, কীভাবে যাওয়া যায়, কোথায় থাকা যেতে পারে এবং সম্ভাব্য খরচসহ বিভিন্ন তথ্য যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু জায়গায় নেটওয়ার্ক সুবিধা, পার্কিং এবং পাবলিক টয়লেটের মতো ব্যবহারিক তথ্যও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব মানচিত্র, কুইজ ও ম্যাপভিত্তিক ছোট গেম যুক্ত করা হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করা যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত ভ্রমণ মানচিত্রের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্যবহারকারীরা নিজেদের ভ্রমণ করা জেলার মানচিত্র তৈরি করে তা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করতে শুরু করেন। এতে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশ এবং অন্যদের ভ্রমণে উৎসাহ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে একটি সাধারণ ম্যাপিং ফিচার দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টে পরিণত হয়েছে।
সাব্বির জানিয়েছেন, ওয়েব অ্যাপটি তাঁর আয়ের প্রধান উৎস নয়। সফটওয়্যার ডিজাইনের পাশাপাশি তিনি লিথুয়ানিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন এবং নিজের ‘ডিজাইন মিঙ্গেল’ নামের এজেন্সিও রয়েছে। বর্তমানে বিজ্ঞাপন দিয়ে ওয়েবসাইটটি ভারী করার পরিবর্তে বিনা মূল্যে সেবা চালু রাখার দিকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। একটি ভ্রমণভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্র্যান্ড সহযোগিতাও হয়েছে।
আগামীতে ব্যবহারকারীর ভ্রমণের অভ্যাস বিশ্লেষণ করে ‘ট্রাভেল পার্সোনালিটি’ কার্ড এবং বিভিন্ন অর্জনের ব্যাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ৬৪ জেলা ভ্রমণ করলে বিশেষ ব্যাজ পাওয়ার মতো ফিচারও ভাবা হচ্ছে। এর ফলে একটি তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ভ্রমণ-প্রোফাইল ও সামাজিক অংশগ্রহণের প্ল্যাটফর্মে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ প্রযুক্তিকর্মীদের জন্য এ প্রকল্পের বড় শিক্ষা হলো—এআই ব্যবহার করে শুধু লেখা, ছবি বা ভিডিও তৈরি নয়, বরং স্থানীয় সমস্যার সমাধান এবং নতুন ডিজিটাল সেবা তৈরিও সম্ভব। সাব্বির নিজেও তরুণদের এআইকে বাস্তব দক্ষতা হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন।










০ টি মন্তব্য