https://powerinai.com/

সাম্প্রতিক খবর

পারমাণবিক ঘড়ির পর নতুন যুগ, তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম কার্যকর নিউক্লিয়ার ক্লক

পারমাণবিক ঘড়ির পর নতুন যুগ, তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম কার্যকর নিউক্লিয়ার ক্লক পারমাণবিক ঘড়ির পর নতুন যুগ, তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম কার্যকর নিউক্লিয়ার ক্লক
 

সময় মাপার প্রযুক্তিতে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ভিয়েনা ও বেইজিংয়ে আলাদাভাবে কাজ করা দুটি গবেষক দল বিশ্বের প্রথম কার্যকর ‘নিউক্লিয়ার ক্লক’ বা নিউক্লিয়াসভিত্তিক ঘড়ি তৈরি করেছে। বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত দুটি পৃথক গবেষণাপত্রে এই সাফল্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের মতে, নতুন ধরনের এই ঘড়ি ভবিষ্যতে প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়ির চেয়েও বেশি নির্ভুল সময় পরিমাপের সুযোগ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন, যোগাযোগ প্রযুক্তি, জরিপ ও মৌলিক পদার্থবিদ্যার গবেষণায় এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে।

নিউক্লিয়ার ক্লককে অনেকটা প্রচলিত অ্যাটমিক ক্লকের পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৪৯ সালে প্রথম নির্ভুল অ্যাটমিক ক্লক তৈরি হওয়ার পর থেকে অত্যন্ত নিখুঁত সময় পরিমাপের ক্ষেত্রে পারমাণবিক ঘড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে সেরা পারমাণবিক ঘড়িগুলো কয়েক বিলিয়ন বছরে মাত্র এক সেকেন্ড পর্যন্ত ভুল করতে পারে। বৈশ্বিক ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, মোবাইল যোগাযোগ এবং ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্কে এমন নির্ভুল সময় সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন নিউক্লিয়ার ক্লকের মূল পার্থক্য এর সময় মাপার পদ্ধতিতে। প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়িতে পরমাণুর বাইরের অংশে থাকা ইলেকট্রনকে এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে পরিবর্তন করানো হয় এবং সেই পরিবর্তনকে সময়ের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার ক্লকে পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসের ভেতরের শক্তিস্তরের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ কাজে অত্যন্ত শক্তিশালী লেজার ব্যবহার করা হয়। গবেষকদের ধারণা, নিউক্লিয়াসের আকার অত্যন্ত ছোট হওয়ায় এর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আরও নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে সময় পরিমাপের নির্ভুলতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

দুটি গবেষক দলই তাদের নিউক্লিয়ার ক্লকের জন্য থোরিয়াম-২২৯ নামের একটি বিশেষ আইসোটোপ ব্যবহার করেছে। এই আইসোটোপকে কঠিন অবস্থার ক্যালসিয়াম ফ্লোরাইড স্ফটিকের মধ্যে আটকে রেখে এর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে লেজারের মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বেইজিংয়ের গবেষক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ শিকিয়াং ডিং। অন্যদিকে ভিয়েনার গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পদার্থবিদ থরস্টেন শুম। দুই দল স্বাধীনভাবে ভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে কাজ করেও প্রায় একই সময়ে কার্যকর থোরিয়াম-২২৯ নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

ভিয়েনার গবেষক থরস্টেন শুমের মতে, নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করা পদার্থবিদদের প্রায় পাঁচ দশকের একটি বড় লক্ষ্য ছিল। তাঁর দল ২০০৮ সাল থেকে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তবে নতুন ঘড়ি তৈরি হলেও গবেষকেরা এটিকে এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন না। শুম জানিয়েছেন, বর্তমান নিউক্লিয়ার ক্লক কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা থেকে এখনও অনেক দূরে রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত স্ফটিক ও শক্তিশালী লেজার একত্র করা গেলে এর কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যবহারও বেশ বিস্তৃত। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ক্লক স্যাটেলাইটভিত্তিক ন্যাভিগেশন, ডেটা ট্রান্সফারের সময় সমন্বয়, ভূমি জরিপ এবং মেট্রোলজির মতো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবস্থায় বিভিন্ন ডিভাইস ও নেটওয়ার্কের মধ্যে সময়ের অত্যন্ত সূক্ষ্ম সমন্বয় প্রয়োজন হয়। সময় পরিমাপের নির্ভুলতা আরও বাড়ানো গেলে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতাও উন্নত হতে পারে।

মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা অত্যন্ত নিখুঁত সময়ের ওপর নির্ভরশীল। একটি ঘড়ির সামান্য ভুলও অবস্থান নির্ধারণে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। তাই ভবিষ্যতে যদি নিউক্লিয়ার ক্লক প্রচলিত অ্যাটমিক ক্লকের তুলনায় আরও নির্ভুল এবং একই সঙ্গে ছোট ও ব্যবহারযোগ্য করে তৈরি করা যায়, তাহলে স্যাটেলাইট ও অন্যান্য ন্যাভিগেশন প্রযুক্তিতে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ক্লককে কম ওজনের এবং তুলনামূলক কম ভঙ্গুর করাও সম্ভব হবে।

শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবহার নয়, মৌলিক পদার্থবিদ্যার গবেষণাতেও নিউক্লিয়ার ক্লক নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভিয়েনার গবেষক দল তাদের তৈরি ঘড়ি ব্যবহার করে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য প্রভাব শনাক্ত করার একটি পরীক্ষা চালিয়েছে। যদিও সেই পরীক্ষায় ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে গবেষকদের দাবি, নিউক্লিয়ার ক্লকটি বর্তমানে ব্যবহৃত সেরা পারমাণবিক ঘড়িগুলোর কাছাকাছি পর্যায়ের সক্ষমতা দেখিয়েছে।

ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের বিপুল অংশ এমন এক ধরনের পদার্থ দিয়ে গঠিত হতে পারে যা সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু মহাকর্ষীয় প্রভাবে তার অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ি ব্যবহার করে সময়ের ক্ষুদ্র পরিবর্তন বা পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ধ্রুবকের সম্ভাব্য পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের রহস্য নিয়ে আরও সূক্ষ্ম গবেষণা করা সম্ভব হতে পারে।

তবে নিউক্লিয়ার ক্লক এখনই সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে না। প্রযুক্তিটি এখনও গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে এবং এর নির্ভুলতা, স্থায়িত্ব, আকার ও ব্যবহারিক খরচের মতো বিষয়গুলোতে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন। গবেষকদের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো পরীক্ষাগারে তৈরি এই প্রযুক্তিকে আরও নির্ভরযোগ্য, শক্তিশালী এবং ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।

তারপরও দুটি স্বাধীন গবেষক দলের প্রায় একই সময়ে কার্যকর নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরির ঘটনা সময় পরিমাপ প্রযুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অ্যাটমিক ক্লকের পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে এই প্রযুক্তি সফলভাবে উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতের স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং অতি-নির্ভুল পরিমাপ প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে।








০ টি মন্তব্য



মতামত দিন

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার মতামতটি দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।







পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? পুনরায় রিসেট করুন






রিভিউ

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার রিভিউ দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।