আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটগ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন; মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশ ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য যুক্তি বোঝা যায়: ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা রক্ষা, গোপন ব্যালট নিশ্চিত করা, বুথের ভেতর থেকে অননুমোদিত ছবি-ভিডিও ছড়ানো ঠেকানো, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব বা উসকানি নিয়ন্ত্রণ। এগুলো তুচ্ছ নয়; একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এই লক্ষ্যগুলো ছাড়া সম্ভবও না।
কিন্তু সমালোচনার জায়গাটা “উদ্দেশ্য” নয়, “পদ্ধতি”। প্রশ্ন হলো: এটা কি বাস্তবসম্মত এবং আনুপাতিক (proportionate)? ৪০০ গজ মানে প্রায় ১,২০০ ফুটের কাছাকাছি। এই বড় এলাকাজুড়ে “কারও মোবাইল থাকবে না” বাস্তবে কী দাঁড়ায়? বেশিরভাগ ভোটারকে ফোন ঘরে রেখে যেতে হবে, বা কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই কাউকে ধরিয়ে দিতে হবে। আর এই বাস্তবতা অন্তত চারটি ঝুঁকি তৈরি করে।
১) ভোটার উপস্থিতি কমার আশঙ্কা
মোবাইল এখন শুধু বিনোদন নয়; এটি নিরাপত্তা, যোগাযোগ, পথনির্দেশ, জরুরি সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে সমন্বয়। নারী, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, কিংবা যাদের নিরাপত্তা-উদ্বেগ বেশি, তারা “ফোন ছাড়া” কেন্দ্রে যেতে দ্বিধায় পড়তে পারেন। ভোটার উপস্থিতি কমে গেলে নির্বাচন যতই প্রযুক্তিগতভাবে নিখুঁত হোক, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হয়।
২) জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা-ঝুঁকি
কেন্দ্র বা আশপাশে সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা, অসুস্থতা, দুর্ঘটনা হলে ভোটার দ্রুত কারও সঙ্গে যোগাযোগ করবেন কীভাবে? “ফোন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে” বলা সহজ, কিন্তু ভিড়, চাপ, আতঙ্কের মধ্যে সেটি কতটা কার্যকর হবে তা অনিশ্চিত। ৪০০ গজের নিষেধাজ্ঞা কার্যত একটি বড় এলাকাকে “যোগাযোগহীন” করে ফেলতে পারে।
৩) সাংবাদিকতা ও নাগরিক পর্যবেক্ষণে ধাক্কা
মোবাইলভিত্তিক সাংবাদিকতা (মোজো) এখন বাস্তবতার অংশ। ঘটনা ঘটলে দ্রুত নথিভুক্ত করা, তথ্য যাচাই, লাইভ আপডেট, এগুলো অনেক সময় মোবাইল ছাড়া সম্ভব হয় না। এই নিষেধাজ্ঞা সাংবাদিকদের কাজকে জটিল করে তুলতে পারে বলেই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি উদ্বেগ জানিয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান করেছে। আরও একটি সমস্যা হলো নীতির প্রয়োগ নিয়ে স্পষ্টতা: একজন নির্বাচন কমিশনার নিজেই বলেছেন যে গণমাধ্যমকর্মীরা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন কি না, তা এখনও “পুরোপুরি স্পষ্ট” নয়। নীতিতে এই ধোঁয়াশা মাঠে অপব্যবহার, হয়রানি, এবং অযথা সংঘাত বাড়াতে পারে।
৪) “শুধু অফিসিয়াল ক্যামেরা”র সীমাবদ্ধতা
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা বাড়াতে কিছু উদ্যোগ আছে, যেমন পুলিশ সদস্যদের জন্য বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের তথ্য এসেছে। তবে নীতিগতভাবে প্রশ্ন থাকে: কোনো নজরদারি ব্যবস্থা যদি পুরোপুরি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সেটি একাই জনআস্থার ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। স্বচ্ছতার একটি বড় অংশ আসে বহুমুখী পর্যবেক্ষণ থেকে: নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম, এবং নাগরিক নজরদারি একসঙ্গে থাকলে জবাবদিহি শক্ত হয়।
তবু একটি কঠিন সত্য: মোবাইল সবসময় “ভালো” নয়
এ কথাও পরিষ্কার: ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট করার একটি বড় উপায় হলো ব্যালটের ছবি তুলে প্রমাণ দেখানো। এতে ভোট কেনাবেচা, ভয়ভীতি, বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ তৈরি হয়। গুজব-ভিডিও দ্রুত ছড়ালে উত্তেজনাও বাড়তে পারে। তাই “মোবাইল ১০০% ভালো” যেমন সরলীকরণ, “মোবাইল ১০০% খারাপ” তাও। লক্ষ্য হওয়া উচিত ঝুঁকি কমিয়ে সুবিধা রাখা।
তাহলে করণীয় কী: নিষেধাজ্ঞা নয়, স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ
এখানে নির্বাচন কমিশনের জন্য বাস্তবসম্মত কয়েকটি বিকল্প আছে, যা গোপন ব্যালট রক্ষা করবে, আবার ভোটার আস্থা ও অংশগ্রহণও নষ্ট করবে না।
• ফোন বহন অনুমতি, কিন্তু বুথে ক্যামেরা-নিষেধ
ভোটার ফোন সঙ্গে রাখতে পারবেন; তবে কেন্দ্রের ভেতরে ফোন সাইলেন্ট/এয়ারপ্লেন মোডে থাকবে, এবং ব্যালট বুথে ছবি/ভিডিও শূন্য সহনশীলতা (zero tolerance) নীতি থাকবে। অতীতে কমিশন ভোটকেন্দ্রে মোবাইল বন্ধ রাখতে বলার নজিরও আছে।
• ফোন ডিপোজিট/“ফোন পার্কিং” ব্যবস্থা
যারা চাইবেন, তারা টোকেন নিয়ে ফোন জমা রাখবেন। এতে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় থাকে, আবার ভোটারকে “ফোন ঘরে রেখে আসা” বাধ্যবাধকতায় পড়তে হয় না।
• গণমাধ্যমের জন্য স্পষ্ট, লিখিত একপাতার নীতিমালা
কে কোথায় ছবি তুলবে, কোথায় লাইভ করবে, কী শর্তে করবে, কীভাবে পরিচয় যাচাই হবে—সব স্পষ্ট করলে মাঠের সংঘাত কমে।
• নিষেধাজ্ঞার পরিসর যৌক্তিক করা
৪০০ গজ একটি খুব বড় এলাকা। যুক্তিসংগত হতে পারে “কেন্দ্রের ভেতর/বুথ এলাকা”-কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, কিন্তু চারপাশের বিশাল পরিসরকে নয়। পদ্ধতি যত লক্ষ্যভিত্তিক হবে, ততই তা গ্রহণযোগ্য হবে।
শেষ কথা
নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য যদি হয় সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, তাহলে এমন নীতি দরকার যা একদিকে গোপন ব্যালট ও শৃঙ্খলা রক্ষা করবে, অন্যদিকে ভোটার আস্থা, নিরাপত্তা, সাংবাদিকতা, এবং স্বচ্ছতাকে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। ৪০০ গজ এলাকায় “কমপ্লিট ফোন-নিষেধ” কাগজে কঠোর মনে হলেও বাস্তবে এটি অংশগ্রহণ ও আস্থার নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। তাই এখনই সময়: সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করে ঝুঁকি-ভিত্তিক, আনুপাতিক, এবং বাস্তবসম্মত “স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ” নীতিতে যাওয়া।








০ টি মন্তব্য