বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বনাঞ্চলে আগুনের ঝুঁকি শনাক্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন এমন সব কাজে এআই ব্যবহার করছে, যেগুলো আগে সম্পন্ন করতে বিপুল সময়, অর্থ এবং জনবল প্রয়োজন হতো। বিশেষ করে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা নির্ধারণ এবং কয়েক দশকের পুরোনো গবেষণার নথি ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে এআই পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা পরিবেশের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
৭ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, পরিবেশ, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন খাতে কাজ করা ১৫টি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পেরেছে, সব প্রতিষ্ঠানই কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা সম্পর্কে আশাবাদী হলেও ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এআইয়ের ব্যবহার কীভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তা করছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ কেনিয়ার হাতি সংরক্ষণ কার্যক্রম। সেভ দ্য এলিফ্যান্টস নামের একটি সংস্থা বন্যপ্রাণীর সংখ্যা নির্ধারণ এবং হাতির চলাচল ও যোগাযোগ নিয়ে গবেষণায় মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, কেনিয়ার একটি বড় সংরক্ষিত এলাকায় আকাশপথে জরিপ চালিয়ে প্রায় দুই লাখ ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল। আগে এসব ছবি বিশ্লেষণ করতে নয়জন গবেষকের প্রায় নয় মাস সময় লাগত। কিন্তু এআইভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে একই ধরনের কাজ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। মানুষের করা আগের জরিপে অনেক প্রাণী গণনা থেকে বাদ পড়েছিল। সংস্থাটির প্রধান ফ্র্যাঙ্ক পোপের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হাতি, অর্ধেকের মতো জেব্রা ও জিরাফ এবং প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অরিক্সের সংখ্যা সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব প্রাণীর উপস্থিতি আরও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে।
বন্যপ্রাণীর সঠিক সংখ্যা জানা শুধু গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; সংরক্ষণ কার্যক্রমে অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরিতেও এর প্রয়োজন রয়েছে। কোনো অঞ্চলে নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আবার কোনো সংরক্ষিত এলাকায় প্রাণীর সংখ্যা ও চলাচলের ধরন পরিবর্তিত হলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে সংরক্ষণ নীতিমালা সংশোধন করা সম্ভব।
এআইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যবহার দেখা যাচ্ছে জেন গুডঅল ইনস্টিটিউটের গবেষণায়। তানজানিয়ার গোম্বে ন্যাশনাল পার্কে শিম্পাঞ্জির আচরণ নিয়ে কয়েক দশক ধরে হাতে লেখা গবেষণার নথি সংরক্ষিত রয়েছে। এসব নথি স্থানীয় কি-হা ভাষা এবং বৈজ্ঞানিক সংক্ষিপ্ত শব্দে লেখা হওয়ায় ডিজিটাল রূপান্তর করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ছিল। আগে পুরো কাজ শেষ করতে ১৩ থেকে ১৫ বছর লাগতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের সহায়তায় তৈরি এআই টুল ব্যবহার করে নথি স্ক্যান, অনুবাদ এবং তথ্য কাঠামোবদ্ধ করার প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিলিয়ান পিন্টিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির সম্ভাব্য সময় কমে প্রায় দুই বছরে এসেছে।
এদিকে কম্বোডিয়ার বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি শনাক্ত করতেও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য আগুনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরপর স্থানীয় বনরক্ষীদের কাছে দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে দুর্গম এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তির পরিবেশগত মূল্যও রয়েছে। এআই মডেল পরিচালনার জন্য বড় ডেটা সেন্টারে অসংখ্য সার্ভার ব্যবহার করা হয়। এসব সার্ভার চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি ব্যবহার করতে হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালে বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার বছরে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ডেটা সেন্টারের পানির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কিছু পরিবেশবাদী সংস্থা এআই ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট একই প্রশ্নের উত্তর বারবার তৈরি না করে আগের ফলাফল সংরক্ষণ করছে। নেচার কনজারভেন্সি মাছ ধরার জাহাজে ধারণ করা ভিডিও সরাসরি জাহাজের ভেতরেই বিশ্লেষণের জন্য এআই ক্যামেরা ব্যবহার করছে। এতে বিপুল ভিডিও ডেটা কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠানোর প্রয়োজন কমছে।
এআই যে পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তা স্পষ্ট। তবে প্রযুক্তির সুবিধা যেন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ এবং কম শক্তি ব্যবহারকারী এআই মডেল তৈরি করা গেলে প্রকৃতি সংরক্ষণে প্রযুক্তিটির ভূমিকা আরও কার্যকর হতে পারে।









০ টি মন্তব্য