বহুতল ভবনের লিফটে উঠতে গিয়ে একটি বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে—লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার পরপরই মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যায়, কখনো আবার পুরোপুরি সিগন্যাল হারিয়ে যায়। ফলে জরুরি ফোন করা বা কল গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু লিফটের ভেতরে ঢুকলেই কেন এমনটা ঘটে?
এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের একটি পরিচিত ধারণা, যার নাম ‘ফ্যারাডে কেজ’। সহজভাবে বললে, ধাতব কোনো আবরণ যখন চারপাশ থেকে একটি জায়গাকে ঘিরে রাখে, তখন সেটি বাইরের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ও তড়িৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গের প্রবেশে বাধা তৈরি করতে পারে।
লিফট কীভাবে ফ্যারাডে কেজের মতো কাজ করে?
লিফটের কাঠামোর বড় একটি অংশ ধাতু দিয়ে তৈরি। ফলে পুরো কেবিনটি অনেকটা একটি ধাতব খাঁচার মতো আচরণ করে। লিফটের দরজা খোলা থাকলে বাইরে থেকে মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পায়।
কিন্তু দরজা বন্ধ হওয়ার পর চারপাশের ধাতব আবরণ সিগন্যালের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে লিফটের ভেতরের ধাতব কাঠামো যত বেশি আবদ্ধ হবে, মোবাইলের রেডিও সিগন্যালের জন্য ভেতরে পৌঁছানো তত কঠিন হতে পারে। এর ফলে ফোনের নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যায় বা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
তবে সব লিফটে একই মাত্রায় নেটওয়ার্ক দুর্বল হবে—এমন নয়। লিফটের নির্মাণসামগ্রী, কাঠামোর ফাঁক, আশপাশের নেটওয়ার্ক কাভারেজসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সিগন্যালের শক্তি নির্ভর করতে পারে।
ঘরেই করা যায় ছোট একটি পরীক্ষা
ফ্যারাডে কেজের ধারণাটি সহজে বোঝার জন্য বাড়িতেও একটি ছোট পরীক্ষা করা যায়। একটি ধাতব বাক্সের মধ্যে মোবাইল ফোন রেখে অন্য ফোন থেকে কল করলে অনেক সময় রিং শোনা যেতে পারে। কারণ বাক্সে থাকা ছোট ফাঁক দিয়ে কিছু সিগন্যাল ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
কিন্তু ফোনটিকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে ভালোভাবে সম্পূর্ণ ঢেকে দিলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। ফয়েলের আবরণ যদি কার্যকরভাবে সংকেত আটকে দেয়, তখন ফোনে কল পৌঁছানো কঠিন হবে। এভাবেই বোঝা যায়, একটি পরিবাহী ধাতব আবরণ কীভাবে তড়িৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
ফ্যারাডে কেজের ধারণা কোথা থেকে এল?
ফ্যারাডে কেজের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের নাম। ১৮৩৬ সালে তিনি লক্ষ্য করেন, কোনো পরিবাহীর অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চার্জ মূলত তার বাইরের পৃষ্ঠে অবস্থান করে এবং ভেতরের অংশে তার প্রভাব থাকে না।
এই বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখানোর জন্য ফ্যারাডে ধাতব আবরণ ব্যবহার করে একটি বিশেষ কাঠামো তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সেই পরীক্ষার ভিত্তিতেই ‘ফ্যারাডে কেজ’ ধারণাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শুধু লিফটেই নয়, আরও অনেক জায়গায় দেখা যায়
ফ্যারাডে কেজের প্রভাব শুধু লিফটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে বাইরের তড়িৎ–চুম্বকীয় প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে এই নীতির ব্যবহার রয়েছে।
অর্থাৎ, লিফটে ঢোকার পর মোবাইলের নেটওয়ার্ক হারিয়ে যাওয়া কোনো রহস্য নয়। লিফটের ধাতব কাঠামো এবং মোবাইল সিগন্যালের বৈশিষ্ট্যের কারণে তৈরি হওয়া এই ঘটনা আসলে পদার্থবিজ্ঞানের একটি বাস্তব উদাহরণ।
সূত্র: বিবিসি আর্থ সায়েন্স








০ টি মন্তব্য