কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত বাড়তে থাকা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উচ্চ বাজারমূল্য এবং ঋণের পরিমাণ বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত The Guardian-এর প্রতিবেদনে সংস্থাটির Global Financial Stability Report-এর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আইএমএফের আশঙ্কা, এআই কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় বা মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারমূল্যে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে, যার প্রভাব অন্য বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গত কয়েক বছরে এআই প্রযুক্তির উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার, কম্পিউটিং অবকাঠামো, চিপ এবং নতুন মডেল তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এসব বিনিয়োগের পেছনে যুক্তি হলো, ভবিষ্যতে এআই ব্যবসা, গবেষণা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনবে। তবে প্রত্যাশিত আয় কত দ্রুত আসবে এবং সব প্রতিষ্ঠান এই বিনিয়োগ থেকে লাভবান হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আইএমএফের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজারে ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। The Guardian-এর তথ্য অনুযায়ী, Alphabet, Amazon, Apple, Meta, Microsoft, Nvidia ও Tesla—এই সাত প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অংশ যুক্তরাষ্ট্রের S&P 500 শেয়ার সূচকের ৩৫ শতাংশের বেশি। এক দশক আগে এই অংশ ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। এর অর্থ, কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্যের পরিবর্তন এখন বৃহত্তর শেয়ারবাজারের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
ঝুঁকির একটি বড় কারণ হলো ঋণনির্ভর বিনিয়োগ। ডেটা সেন্টার ও উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরি করতে বিপুল মূলধন প্রয়োজন। কোনো কোম্পানি ভবিষ্যতে এআই সেবা থেকে বড় আয় হবে ধরে নিয়ে ঋণ করে বিনিয়োগ করলে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার পরিস্থিতিতে আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। শেয়ারমূল্য কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা সম্পদ বিক্রি করতে পারেন, নতুন অর্থায়ন কঠিন হতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে পারে।
আইএমএফ আরও সতর্ক করেছে যে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও তুলনামূলক দুর্বল এআই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক অর্থায়ন এবং ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি ঝুঁকিকে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়লে তার অংশীদারদের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিবেদনে হাইপারস্কেলার প্রতিষ্ঠান ও দুর্বল এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে গত তিন বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন, ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়নের ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আইএমএফের সতর্কতার অর্থ এই নয় যে এআই খাতে নিশ্চিতভাবেই বাজার ধস ঘটবে। বরং এটি সম্ভাব্য ঝুঁকির মূল্যায়ন। এআই প্রযুক্তির বাস্তব উৎপাদনশীলতা, ব্যবসায়িক ব্যবহার এবং আয় বৃদ্ধির সঙ্গে বিনিয়োগের পরিমাণের সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদি প্রযুক্তি থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়, তাহলে বিনিয়োগের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে। বিপরীতে, আয় কম হলে বা ব্যয় বেশি হলে বাজারে সংশোধনের সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রতিবেদনে আর্থিক ব্যবস্থার জন্য আরও দুটি ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে—সরকারি ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বড় ধরনের সাইবার হামলা। এআই প্রযুক্তি সাইবার নিরাপত্তা উন্নত করতে পারে, আবার আক্রমণকারীদের কিছু কাজ দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় করতেও সহায়তা করতে পারে। ফলে প্রযুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নে সাইবার ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের অস্থিরতা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তিসেবা, ক্লাউড অবকাঠামোর ব্যয় এবং রপ্তানিমুখী ব্যবসার ওপর বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাংলাদেশের ওপর কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক বাজারের গতিপ্রকৃতি ও দেশের অর্থনৈতিক সংযোগের ওপর। আইএমএফের সতর্কতা মূলত বিনিয়োগের ঝুঁকি পরিমাপ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত প্রবৃদ্ধির বাস্তব ফলাফল যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।










০ টি মন্তব্য