বাংলাদেশে জনসচেতনতা তৈরির “মাঠ” গত এক দশকে মৌলিকভাবে বদলে গেছে। আগে বাজার, চায়ের দোকান, স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদের উঠান—এসব জায়গায় কথার কেন্দ্র ছিল। এখন কেন্দ্রটা অনেকখানি স্ক্রিনে: ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ/মেসেঞ্জার গ্রুপ। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করলে বাস্তবতাই অস্বীকার করা হয়। মসজিদের শক্তি হলো নৈতিক কর্তৃত্ব ও জনআস্থা—কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শক্তি হলো গতি ও পৌঁছানো। প্রশ্ন হলো: এই দুই শক্তিকে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে একসাথে আনা যায়, যাতে তরুণদের মধ্যে গঠনমূলক জনসচেতনতা তৈরি হয়—বিভাজন নয়, সহমর্মিতা ও সত্যনিষ্ঠা বাড়ে?
তরুণ প্রজন্ম কেন বিমুখ হচ্ছে
আজকের তরুণেরা “অন-ডিমান্ড” উত্তর খোঁজে—যখন দরকার, তখনই। খুতবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ; সোশ্যাল মিডিয়া ২৪/৭ খোলা। মানসিক চাপ, সম্পর্ক, ক্যারিয়ার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আসক্তি, অনলাইন হয়রানি—এ ধরনের জরুরি প্রশ্নে দ্রুত উত্তর পেতে তারা স্বাভাবিকভাবেই অনলাইনে যায়। দ্বিতীয় সমস্যা আরও সূক্ষ্ম: অনেক ক্ষেত্রে খুতবা/বয়ান সমকালীন ভাষা ও প্রেক্ষাপট ধরতে পারে না। ফলে তরুণের মনে হয়, মিম্বর “তাদের জীবনের” কথা বলছে না। দাওয়াহ কার্যকর হয় তখনই, যখন শ্রোতার বাস্তবতা বোঝা যায়—এটাই আধুনিক দাওয়াহ-চিন্তার সারকথা।
খুতবা ও আলোচনার সীমাবদ্ধতা—সমস্যাটা কোথায়
কিছু জায়গায় খুতবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে পড়ে: একই বিষয় ঘুরেফিরে আসে, কিন্তু জীবনের জটিল প্রশ্ন—অর্থনৈতিক ন্যায়, শ্রমের মর্যাদা, মাদক/জুয়া/পর্ন আসক্তি, পরিবারে সহিংসতা, গুজব, সাইবার বুলিং, নারীর মর্যাদা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, বিজ্ঞানমনস্কতা—এসব যথাযথভাবে উঠে আসে না। এতে মসজিদ ও সমাজের বাস্তব জীবনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ধর্মীয় বয়ান তখন মানুষকে নৈতিকতা শেখায় ঠিকই, কিন্তু দৈনন্দিন আচরণ বদলাতে যে “করণীয়-ভিত্তিক” দিশা লাগে, তা অনুপস্থিত থাকে। ফলাফল: তরুণেরা আধ্যাত্মিকতার বদলে “মোটিভেশনাল ক্লিপ” বা উগ্র কনটেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়ে—যেখানে উত্তেজনা আছে, কিন্তু দায়িত্ব নেই।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মসজিদের ভূমিকা—কীভাবে হবে কার্যকর
ডিজিটালে যাওয়া মানে মসজিদকে “কনটেন্ট-ফ্যাক্টরি” বানানো নয়; বরং মসজিদের সামাজিক দায়িত্বকে দায়িত্বশীল যোগাযোগে রূপ দেওয়া। কয়েকটি বাস্তবধর্মী পথ—
খুতবার সারাংশ ৬০–৯০ সেকেন্ডে
প্রতি শুক্রবার ৩টি মূল বার্তা—ভদ্র ভাষায়, অ-উসকানিমূলক, যাচাইযোগ্য উদাহরণসহ। “আজকের করণীয়” হিসেবে শেষ লাইন দিন: গুজব শেয়ার না করা, রাস্তায় শৃঙ্খলা, পরিবারে সহনশীলতা, কর্মক্ষেত্রে সততা—ছোট কিন্তু বাস্তব লক্ষ্য।
প্রশ্নোত্তর (Q&A) লাইভ/রিকর্ডেড
তরুণদের বাস্তব প্রশ্ন—মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, পড়াশোনা, চাকরি, অনলাইন নিরাপত্তা—এসব নিয়ে সংযত, সহানুভূতিশীল, তথ্যভিত্তিক উত্তর। এখানে একটি নীতি জরুরি: “ফতোয়া-ধাঁচের দ্রুত সিদ্ধান্ত” নয়; বরং নৈতিক দিকনির্দেশ + প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তার রেফারাল।
ডিজিটাল নৈতিকতা ও নাগরিকতা
গুজব না ছড়ানো, ভিন্নমতকে সম্মান, অনলাইন হয়রানি/বুলিং বন্ধ, নারীর মর্যাদা রক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা—এসব ধর্মীয় নৈতিকতার সাথে সহজেই যুক্ত করা যায়। তরুণদের কাছে এটি খুব বিশ্বাসযোগ্য হয়, যদি ভাষা হয় মানবিক এবং উদাহরণ হয় বাস্তব।
কমিউনিটি সার্ভিস-ফোকাসড বার্তা
রক্তদান, দুর্যোগ প্রস্তুতি, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা, ট্রাফিক শৃঙ্খলা—এগুলোতে মসজিদের প্রভাব সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধকারী। ধর্মীয় বক্তব্য যখন সেবার কর্মসূচিতে রূপ নেয়, তখন সেটি “বয়ান” থেকে “সমাজগঠন” হয়ে ওঠে।
ইয়ুথ ভলান্টিয়ার টিম—কিন্তু নীতিমালাসহ
মসজিদের অধীনে “Youth Digital Volunteers” হতে পারে—যারা ভিডিও কাটিং, পোস্টিং, কমেন্ট মডারেশন, ইভেন্ট ডকুমেন্টেশন করবে। শর্ত থাকবে স্পষ্ট: ঘৃণা/বিভাজন/গুজব নয়, ব্যক্তি আক্রমণ নয়, কনফিডেনশিয়ালিটি রক্ষা, তথ্য যাচাই।
ঝুঁকি ও রক্ষাকবচ—এটা না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ
ডিজিটাল মিম্বরের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল তথ্য, অতিরঞ্জিত দাবি, এবং বিভাজনমূলক বক্তব্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় একবার ভুল বার্তা ছড়ালে তা সংশোধন করা কঠিন—এবং ধর্মের নামে ভুল ছড়ালে ক্ষতি আরও গভীর হয়। তাই দরকার—
কনটেন্ট গাইডলাইন: ঘৃণা-ভাষা, দলীয় প্রচার, ব্যক্তি আক্রমণ—কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
ফ্যাক্ট-চেক সংস্কৃতি: কোনো পরিসংখ্যান/ঘটনা বললে উৎস যাচাই; সন্দেহ হলে “জানি না” বলার সততা
মডারেশন: কমেন্ট সেকশনে গালাগালি/হুমকি/হয়রানি বন্ধ; নীতিভঙ্গকারীদের ব্লক
মিডিয়া লিটারেসি প্রশিক্ষণ: ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ভলান্টিয়ারদের জন্য—কীভাবে সংবেদনশীল ইস্যুতে দায়িত্বশীল থাকা যায়, কীভাবে গুজব চেনা যায়, কীভাবে তরুণদের ভাষায় কথা বলা যায়
রাজনীতি-সতর্কতা: মসজিদ যেন “উত্তেজনার মঞ্চ” না হয়—কারণ উত্তেজনা দ্রুত ভাইরাল হয়, কিন্তু সমাজে আস্থার ভিত্তি ভেঙে দেয়
উপসংহার
মসজিদের শক্তি নৈতিক কর্তৃত্ব ও জনআস্থা; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শক্তি গতি ও পৌঁছানো। এই দুই শক্তি যদি দায়িত্বশীলভাবে যুক্ত হয়, তবে বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে গঠনমূলক জনসচেতনতা—সত্যনিষ্ঠা, সহমর্মিতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, এবং সামাজিক দায়িত্ব—আরও শক্ত হতে পারে। কিন্তু শর্ত একটাই: মসজিদকে “বিতর্কের আগুন” নয়, মানবিকতা ও যুক্তিবোধের আশ্রয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে—মাঠেও, স্ক্রিনেও।
এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গণতন্ত্র বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাম্বাসেডর









০ টি মন্তব্য