https://powerinai.com/

সাম্প্রতিক খবর

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে WSIS ফোরাম ২০২৬

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে WSIS ফোরাম ২০২৬ বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে WSIS ফোরাম ২০২৬
 

১. ভূমিকা

ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS) ফোরাম ২০২৬ বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতা, তথ্যসমাজ নির্মাণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তি-ব্যবহার এবং টেকসই উন্নয়নকেন্দ্রিক নীতিনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। WSIS অ্যাকশন লাইনসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রসর করা, অংশীজনভিত্তিক সংলাপ জোরদার করা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এই ফোরাম একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নবায়িত ম্যান্ডেটের আলোকে WSIS ফোরাম এখন শুধু একটি বার্ষিক সম্মেলন নয়; বরং এটি বৈশ্বিক ডিজিটাল ন্যায্যতা, উন্নয়ন, সহযোগিতা এবং নীতিগত সমন্বয়ের একটি কার্যকর কাঠামো। ২০২৬ সালের ফোরাম বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি WSIS+20 পর্যালোচনার পর আয়োজিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফোরাম।

২. প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও আন্তর্জাতিক তাৎপর্য

WSIS ফোরাম সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, প্রযুক্তিগত সম্প্রদায়, একাডেমিয়া, যুবসমাজ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিসংলাপের প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করে। ITU-এর নেতৃত্বে UNESCO, UNDP এবং UNCTAD-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই ফোরাম WSIS ফলাফলসমূহের অনুসরণে একটি সমন্বিত জাতিসংঘব্যবস্থাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করে।

ফোরামের উচ্চপর্যায়ের পর্বে মন্ত্রী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রধান নির্বাহী, সুশীল সমাজের নেতৃত্ব, রাষ্ট্রদূত, মেয়র এবং জাতিসংঘ সংস্থার প্রধানরা অংশগ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক নীতি-অঙ্গীকার এবং জাতীয় বাস্তবায়ন কাঠামোর মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে।

৩. বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিকতা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে WSIS ফোরাম ২০২৬ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়ন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক উদ্ভাবন, ই-গভর্ন্যান্স, কমিউনিটি কানেক্টিভিটি, নারী ও তরুণদের ডিজিটাল অংশগ্রহণ এবং উন্নয়নমুখী গণযোগাযোগের প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই ফোরাম নিম্নোক্ত কারণে তাৎপর্যপূর্ণ:

ক. জাতীয় অগ্রাধিকার উপস্থাপনের সুযোগ

বাংলাদেশ তার ডিজিটাল রূপান্তর, জনসেবা ডিজিটালাইজেশন, স্থানীয় উদ্ভাবন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তথ্যপ্রাপ্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে পারবে।

খ. বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ জোরদার করার ক্ষেত্র

সরকারি প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ, বেসরকারি খাত, শিক্ষাঙ্গন, প্রযুক্তি-সম্প্রদায়, কমিউনিটি মিডিয়া ও যুবসমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী বহুপক্ষীয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারবে।

গ. নীতিগত শিক্ষা ও সহযোগিতা সম্প্রসারণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য-উপাত্ত শাসন, ডিজিটাল বৈষম্য, বহুভাষিক ডিজিটাল পরিবেশ, অনলাইন নিরাপত্তা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।

ঘ. বাংলাদেশি অর্জনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্প্রসারণ

ICT4D, কমিউনিটি মিডিয়া, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, তৃণমূল যোগাযোগ এবং জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন উদ্যোগসমূহকে বৈশ্বিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব হবে।

৪. বাংলাদেশের সম্ভাব্য অগ্রাধিকার বিষয়সমূহ

WSIS ফোরাম ২০২৬-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে কৌশলগতভাবে ফলপ্রসূ করতে কয়েকটি অগ্রাধিকার বিষয় সামনে আনা যেতে পারে:

সবার জন্য সাশ্রয়ী ও অর্থবহ সংযোগব্যবস্থা

বাংলা ভাষাভিত্তিক ও বহুভাষিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেম

নারীর ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও নিরাপত্তা

যুবসমাজের ডিজিটাল নেতৃত্ব ও উদ্ভাবন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার ও ন্যায়ভিত্তিক শাসন

কমিউনিটি মিডিয়া ও স্থানীয় জ্ঞানপ্রবাহ শক্তিশালীকরণ

ডিজিটাল সাক্ষরতা, মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি

বিভ্রান্তিকর তথ্য, ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও অনলাইন ঝুঁকি মোকাবিলা

ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ও জনস্বার্থভিত্তিক প্রযুক্তি

জলবায়ু, দুর্যোগ ও উন্নয়ন-সংকটে প্রযুক্তির জনমুখী প্রয়োগ

৫. প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত প্রস্তুতি প্রক্রিয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ বিবেচনা করা যেতে পারে:

১. জাতীয় পরামর্শপ্রক্রিয়া আয়োজন

সরকার, সুশীল সমাজ, বেসরকারি খাত, প্রযুক্তি-উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি মিডিয়া, নারী ও যুব প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় বহুপক্ষীয় পরামর্শ আয়োজন করা যেতে পারে।

২. বাংলাদেশ পজিশন পেপার প্রস্তুত

WSIS অ্যাকশন লাইনসমূহের আলোকে বাংলাদেশের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ, অগ্রাধিকার এবং প্রত্যাশা নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক পজিশন পেপার বা জাতীয় ব্রিফ প্রস্তুত করা প্রয়োজন।

৩. বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা ও সাইড ইভেন্ট পরিকল্পনা

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য বিশেষ সেশন, সাইড ইভেন্ট, প্রদর্শনী বা নীতি-সংলাপ প্রস্তাব করা যেতে পারে।

৪. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার

জাতিসংঘ সংস্থা, উন্নয়ন অংশীদার, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং বৈশ্বিক সুশীল সমাজ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করা প্রয়োজন।

৬. উপসংহার

WSIS ফোরাম ২০২৬ বাংলাদেশের জন্য কেবল অংশগ্রহণের একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ নয়; এটি একটি কৌশলগত নীতিপরিসর, যেখানে বাংলাদেশ তার ডিজিটাল অগ্রযাত্রা, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন-দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল শাসনে গঠনমূলক ভূমিকা তুলে ধরতে পারে।

বাংলাদেশ যদি সুসমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির মাধ্যমে এই ফোরামে অংশগ্রহণ করে, তবে তা শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের কণ্ঠকে আরও শক্তিশালী করবে না, বরং জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল নীতিনির্ধারণ, অংশীজনভিত্তিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যতমুখী ডিজিটাল উন্নয়ন রূপরেখাকেও সমৃদ্ধ করবে।

WSIS ফোরাম ২০২৬ তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সময়োপযোগী সুযোগ, যেখানে বৈশ্বিক আলোচনায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবকেন্দ্রিক করে তোলার পথ সুদৃঢ় করা সম্ভব।

এ এইচ এম বজলুর রহমান | ডিজিটাল গণতন্ত্র ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাম্বাসেডর এবং বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বিএনএনআরসি ২০০২ সাল থেকে জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS) প্রক্রিয়ায় স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্পৃক্ত।








০ টি মন্তব্য



মতামত দিন

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার মতামতটি দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।







পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? পুনরায় রিসেট করুন






রিভিউ

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার রিভিউ দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।