বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইন্টারনেট সাবস্ক্রিপশন দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজারে। কিন্তু ব্যক্তি-স্তরে ইন্টারনেট ব্যবহার এখনো ৪৮.৯ শতাংশ। ১,০০০-এর বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে, প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট ডিজিটাল কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে, তবু অন্তর্ভুক্তি, প্রবেশগম্যতা, গোপনীয়তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বাস আছে, এবং থাকারই কথা। মোবাইল হাতে হাতে পৌঁছেছে। সরকারি সেবা অনলাইনে উঠছে। ব্যাংকিং, বাণিজ্য, যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, সবকিছু ক্রমে স্ক্রিনের ভেতর ঢুকে পড়ছে। এখন এআইও এসে গেছে। ফলে প্রযুক্তি আর কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক জীবনের নতুন অবকাঠামো।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন। এই অবকাঠামো কার জন্য গড়ে উঠছে? নাগরিকের মর্যাদা, অধিকার ও অংশগ্রহণের জন্য, নাকি কেবল ব্যবহারকারী, ডেটা এবং মুনাফার জন্য?
কারণ সংখ্যার চকচকে পৃষ্ঠের নিচে অন্য এক বাংলাদেশও আছে। বাংলাদেশে মোবাইল ফোন সাবস্ক্রিপশন ১৮ কোটি ৫৮ লাখ পেরিয়েছে, ইন্টারনেট সাবস্ক্রিপশন ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার। কিন্তু এই বড় সংখ্যা মানেই এই নয় যে সবাই সমানভাবে ডিজিটাল শক্তির অংশীদার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মাত্র ৪৮.৯ শতাংশ। অর্থাৎ সংযোগের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু ডিজিটাল নাগরিকত্ব এখনো অর্ধেকেরও কম মানুষের হাতে।
অবস্থাটি আরও পরিষ্কার হয় ঘরের ভেতরের ছবি দেখলে। ৯৮.৯ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি মোবাইল ফোন আছে, ৭২.৪ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু কম্পিউটার আছে মাত্র ৯.১ শতাংশ পরিবারে। শহরে স্মার্টফোন আছে ৮০.৮ শতাংশ পরিবারে, গ্রামে ৬৮.৮ শতাংশে। পুরুষদের ৫১.২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, নারীদের ক্ষেত্রে তা ৪৬.৩ শতাংশ। আবার নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানাতেও পার্থক্য আছে: পুরুষ ৬৩.২ শতাংশ, নারী ৫২.৮ শতাংশ। এর মানে ডিজিটাল বাংলাদেশের ভেতরেও আরেকটি বিভক্ত বাংলাদেশ আছে, যেখানে সংযোগের সুযোগ, ডিভাইসের মালিকানা ও ব্যবহারিক ক্ষমতা সমান নয়।
এখানে যারা প্রযুক্তিকে শুধু উন্নয়নের ভাষায় দেখেন, তারা আসল সমস্যাটি এড়িয়ে যান। প্রযুক্তি কেবল সুবিধা দেয় না, ক্ষমতাও বণ্টন করে। কে অনলাইনে দৃশ্যমান হবে, কার ভাষা অগ্রাধিকার পাবে, কার আচরণ নজরদারির আওতায় যাবে, কে বাদ পড়বে, কে মুনাফার উৎস হবে, এই সবকিছুই ডিজিটাল অবকাঠামোর নকশার ভেতরে লুকানো থাকে।
বাংলাদেশ এই সত্যের এক নির্মম উদাহরণ দেখেছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। তখন ইন্টারনেট ও টেক্সট সেবা স্থগিত হয়ে যাওয়ায় নাগরিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো দেখিয়েছে, এই বন্ধের প্রভাব শুধু রাজনৈতিক ছিল না; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ছোট ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, পর্যটন, ব্যাংকিং এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগও। এই অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি জনজীবনের মৌলিক অবকাঠামো। আর মৌলিক অবকাঠামোকে অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না।
রাষ্ট্রও দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। এটুআই ও ইউএনডিপি-সমর্থিত সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১,০০০-এর বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট বৃহত্তর ডিজিটাল রূপান্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শুনতে এটি বড় অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে এটুআই-আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়েছে, এই দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল সেবাসমূহ এখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পুরোপুরি প্রবেশযোগ্য নয়। অর্থাৎ সেবা ডিজিটাল হয়েছে, কিন্তু সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়নি। এখানেই বোঝা যায়, প্রযুক্তি “সবার জন্য” হয় না, তাকে সবার জন্য বানাতে হয়।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতির সরকারি স্বীকৃতিও আছে। জাতিসংঘের ২০২৪ সালের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশ ১৯৩ দেশের মধ্যে ১০০তম স্থানে উঠে এসেছে; ২০২২ সালে অবস্থান ছিল ১১১। এটি অবশ্যই অগ্রগতি। কিন্তু এই সাফল্যের ভেতরেও একটি সতর্কতা আছে: র্যাঙ্কিং বাড়া আর নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হওয়া এক জিনিস নয়। একটি সরকারি পোর্টাল থাকলেই তা স্বচ্ছ হবে না, একটি অ্যাপ থাকলেই তা জবাবদিহিমূলক হবে না, একটি ডিজিটাল সেবা চালু হলেই তা সমতাভিত্তিক হবে না।
এই জায়গায় এসে উপাত্তের প্রশ্নটি সামনে আসে। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের ২১ মে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। একই বছরের ৬ নভেম্বর ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত উপাত্তকে ব্যক্তির মালিকানাধীন হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। আইনগতভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু ডিজিটাল অধিকারের জগতে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, নাগরিক কি জানবেন তাঁর তথ্য কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কার হাতে জমা থাকছে, এবং অপব্যবহার হলে তিনি কোথায় প্রতিকার চাইবেন?
এআই এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ইউনেসকো, ইউএনডিপি, আইসিটি বিভাগ ও এটুআই-সমর্থিত বাংলাদেশের এআই রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, বাংলাদেশের খসড়া জাতীয় এআই নীতি এখনো পর্যালোচনাধীন এবং লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক, নৈতিক ও মানবকেন্দ্রিক এআই উন্নয়ন। এর মানে হলো, এআইকে শুধু উৎপাদনশীলতার যন্ত্র হিসেবে দেখলে হবে না; দেখতে হবে এটি বৈষম্য বাড়াচ্ছে কি না, বাংলা ভাষাকে প্রান্তিক করছে কি না, এবং সিদ্ধান্তগ্রহণকে অস্বচ্ছ করে তুলছে কি না।
এখন কেউ বলতে পারেন, তাহলে কি প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে? মোটেও না। বরং উল্টো। প্রযুক্তিকে মানুষের পক্ষে ফেরত আনার লড়াইটাই এখন জরুরি। কারণ বাজারের যুক্তি সহজ: বেশি ব্যবহারকারী, বেশি ডেটা, বেশি সময়, বেশি মুনাফা। কিন্তু সমাজের যুক্তি আলাদা: বেশি মর্যাদা, বেশি নিরাপত্তা, বেশি অন্তর্ভুক্তি, বেশি জবাবদিহি। এই দুই যুক্তি এক নয়। কখনো কখনো তারা সরাসরি সংঘর্ষে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেই তা দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ৬ কোটি ৪০ লাখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী পরিচিতি ছিল, যা মোট জনসংখ্যার ৩৬.৩ শতাংশের সমান। এই সংখ্যা অবশ্য স্বতন্ত্র ব্যক্তি নয়, “ইউজার আইডেনটিটি”। কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বড়। কারণ এই ডিজিটাল জনপরিসর এখন আর শুধু বন্ধুত্ব, ছবি আর বিনোদনের জায়গা নয়; এটি তথ্য, মতামত, বিভাজন, প্রভাব, প্রচারণা ও আচরণ-নির্মাণের ক্ষেত্র। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে: এই জনপরিসর কি নাগরিকের, নাকি অ্যালগরিদমের?
এই কারণেই “ডিজিটাল এজেন্সি” শব্দটি এখন এত গুরুত্বপূর্ণ। এজেন্সি মানে শুধু মোবাইল চালাতে জানা নয়। এর মানে প্রযুক্তির শর্ত বোঝা। নিজের ডেটা নিয়ে সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া। অন্যায্য নকশা, বৈষম্যমূলক অ্যালগরিদম, অস্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম, এবং অপ্রবেশযোগ্য সরকারি সেবার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা থাকা। আমরা যদি শুধু ব্যবহার করতে শিখি, কিন্তু শর্ত বদলাতে না শিখি, তাহলে আমরা দক্ষ ব্যবহারকারী হতে পারি, স্বাধীন ডিজিটাল নাগরিক হতে পারি না।
বাংলাদেশের সামনে তাই করণীয়ও পরিষ্কার। প্রথমত, ডিজিটাল নীতিকে শুধু উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও স্টার্টআপের ভাষায় না দেখে অধিকার, ন্যায় ও জনস্বার্থের ভাষায় দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি নকশায় প্রবেশগম্যতা, বাংলা ভাষা, প্রতিকারব্যবস্থা, স্বচ্ছতা এবং অ্যালগরিদমিক জবাবদিহিকে বাধ্যতামূলক মানদণ্ড করতে হবে। তৃতীয়ত, এই আলোচনাকে প্রযুক্তিবিদ বা করপোরেট বোর্ডরুমের একচেটিয়া ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, নাগরিক সমাজ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন, নারী সংগঠন, তরুণ, স্থানীয় উদ্যোক্তা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যবহারকারীকেও এই বিতর্কের অংশ হতে হবে।
কারণ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ বলে কোনো নিরীহ, নিরপেক্ষ জিনিস নেই। এটি সবসময়ই কারও অগ্রাধিকার, কারও নকশা, কারও লাভ, কারও ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। তাই এখন প্রশ্ন প্রযুক্তি কত দ্রুত আসছে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কাদের শর্তে আসছে।
বাংলাদেশ সংযোগের যুগে ঢুকে গেছে। এখন দরকার অধিকারের যুগে ঢোকা। বাজারের প্রযুক্তি দরকার, কিন্তু বাজারনির্ভর ভবিষ্যৎ যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন ডিজিটাল বাংলাদেশ দরকার, যেখানে নাগরিক শুধু ইউজার নয়, অংশীদার; শুধু ডেটা নয়, মানুষ; শুধু ভোক্তা নয়, অধিকারসম্পন্ন সত্তা। ডিজিটাল ভবিষ্যৎ পুনর্দখল মানে তাই প্রযুক্তিকে থামানো নয়, প্রযুক্তিকে মানুষের পক্ষে দাঁড় করানো। আর এই কাজটি যত দেরিতে শুরু হবে, তত বেশি কঠিন হবে তা ফিরিয়ে আনা।
লেখক পরিচিতি : এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক, বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর








০ টি মন্তব্য