জেমস কেভিন হ্যারিসের গল্পটি শুরু হয়েছিল তামার খনি থেকে, পরে পৌঁছেছে
সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি-স্টার্টআপে। তাঁর অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা সহজ: বৈশ্বিক
বাণিজ্য যত বড়, তার
ভেতরের অনেক প্রক্রিয়া এখনো ততটাই পুরোনো। জাহাজ চলে আধুনিক ইঞ্জিনে, কিন্তু
পণ্যের দলিল চলে কাগজে;
ব্যাংকিং হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, কিন্তু লেটার অব ক্রেডিটের অনেক ধাপ
এখনো মানুষের হাতে যাচাই করা কাগজের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জন্য এই শিক্ষা
বিশেষভাবে জরুরি। কারণ এখন আমাদের প্রতিযোগিতা শুধু সস্তা শ্রম, শুল্ক
সুবিধা বা বড় অর্ডারের ওপর নির্ভর করে টিকবে না। প্রতিযোগিতার নতুন জায়গা হবে
দ্রুততা, স্বচ্ছতা, তথ্যের
নির্ভরযোগ্যতা এবং ডিজিটাল সংযুক্তি।
বাংলাদেশের বাণিজ্য অর্থনীতির আকার ছোট নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই
পণ্য রপ্তানি আয় ৪৪.৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা পুরো ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৪৪.৪৬
বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৩৬.৫৫
বিলিয়ন ডলার, যা
আগের বছরের তুলনায় ১০.২৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো
শক্তিশালী, কিন্তু
সেটি অত্যন্ত ঘনীভূত এবং পোশাকনির্ভর। এই নির্ভরতা যত বেশি, সরবরাহ
শৃঙ্খলের যেকোনো বিলম্ব,
কাগজপত্রের জট বা বন্দরের অদক্ষতা তত বেশি ঝুঁকি তৈরি করে।
অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য আমাদের জন্য স্থায়ী চাপের জায়গা। বাংলাদেশ
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ছিল ৬৩.২৪ বিলিয়ন ডলার, রপ্তানি আয়
ছিল ৪০.৮১ বিলিয়ন ডলার এবং বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২২.৪৩ বিলিয়ন ডলারে। এই ঘাটতি
শুধু মুদ্রাবাজারের সমস্যা নয়; এটি দেখায় যে আমাদের উৎপাদন, কাঁচামাল, জ্বালানি ও
শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গভীরভাবে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাই ডিজিটাল ট্রেড
ফ্যাসিলিটেশনকে আলাদা কোনো আইটি প্রকল্প হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি আসলে বৈদেশিক
মুদ্রা সাশ্রয়, রপ্তানি
সময় কমানো এবং ব্যবসার খরচ কমানোর অর্থনৈতিক কৌশল।
বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২৪ সালে বন্দরটি ৩২ লাখ ৭৫
হাজার ৬২৭ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.৪২ শতাংশ
বেশি। একই বছরে সামগ্রিক কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়ে দাঁড়ায় ১২.৩৯ কোটি টনে। বন্দরের
গড় জাহাজ অপেক্ষার সময় আগস্টে ৬-৭ দিন পর্যন্ত উঠলেও বছরের শেষে তা এক দিনে নামিয়ে
আনার তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ থেকে বোঝা যায়, অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি, কিন্তু
ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রবাহ
ও সমন্বয় উন্নত করলেও বড় ফল পাওয়া যায়।
এখানেই বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। পণ্য পাঠানোর সময়
কারখানা, ফ্রেইট
ফরোয়ার্ডার, কাস্টমস, ব্যাংক, বন্দর, শিপিং লাইন, ক্রেতা ও
বিমা প্রতিষ্ঠান একই তথ্য একসঙ্গে দেখতে না পারলে বিলম্ব হবেই। একটি কনটেইনার
বন্দরে পড়ে আছে, কিন্তু
কাগজে সেটি জাহাজে উঠেছে বলে দেখানো হচ্ছে, এমন ঝুঁকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে
অস্বাভাবিক নয়। প্রযুক্তির কাজ শুধু ফর্ম অনলাইনে নেওয়া নয়; প্রযুক্তির
আসল কাজ হলো বাস্তব পণ্যের গতিপথ, দলিল, অর্থপ্রদান ও ঝুঁকিকে একই তথ্যব্যবস্থায় যুক্ত করা।
বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো বা বিএসডব্লিউ এই পথে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের সার্টিফিকেট, লাইসেন্স ও
পারমিট বা সিএলপি বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে।
এই ব্যবস্থায় ১৯টি সরকারি সংস্থা যুক্ত হয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের
৩০ জুন পর্যন্ত ৩ লাখ ৮৯ হাজার ১৫টি সিএলপি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইস্যু হয়েছে; এর ৮৫.৯৭
শতাংশ এক ঘণ্টার মধ্যে এবং ৯৪.৬৩ শতাংশ এক দিনের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে। এটি
দেখায়, সঠিকভাবে
বাস্তবায়ন হলে ডিজিটাল ব্যবস্থা সময় কমাতে পারে, মানবিক হস্তক্ষেপ কমাতে পারে এবং
দুর্নীতির সুযোগও সংকুচিত করতে পারে।
তবে সতর্ক থাকার জায়গাও আছে। ডিজিটালাইজেশন মানে কেবল পুরোনো আমলাতন্ত্রকে
অনলাইনে তুলে দেওয়া নয়। যদি ব্যবসায়ীকে একই তথ্য বিভিন্ন দপ্তরে বারবার দিতে হয়, যদি ব্যাংক, কাস্টমস ও
বন্দর আলাদা আলাদা ডেটা-দ্বীপে আটকে থাকে, যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা
ব্যবস্থাটি ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থা নতুন ধরনের
জটিলতা তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ডিজিটাল বাণিজ্যের মূল শব্দ দুটি হলো
ইকোসিস্টেম ও ইন্টারঅপারেবিলিটি। অর্থাৎ একক সফটওয়্যার নয়, বরং
পারস্পরিক সংযুক্ত ব্যবস্থা।
জাতিসংঘের ডিজিটাল ও টেকসই বাণিজ্য সহজীকরণ জরিপেও বাংলাদেশের অগ্রগতি ও
সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে দেখা যায়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সামগ্রিক ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন
স্কোর ৬৯.৮৯ শতাংশ, পেপারলেস
ট্রেড স্কোর ৭০.৩৭ শতাংশ। কিন্তু ক্রস-বর্ডার পেপারলেস ট্রেড স্কোর মাত্র ৩৩.৩৩
শতাংশ। ২০২৩ সালে এই তিনটি স্কোর ছিল যথাক্রমে ৬৩.৪৪, ৫৯.২৬ ও
২৭.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ দেশীয় পর্যায়ে অগ্রগতি হচ্ছে, কিন্তু সীমান্তপারের দলিল বিনিময়, সার্টিফিকেট
অব অরিজিন, স্যানিটারি-ফাইটোস্যানিটারি
সনদ, ডিজিটাল
অথেনটিকেশন ও এলসি-ভিত্তিক পেমেন্টে এখনো বড় ঘাটতি আছে।
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বাস্তবতা হলো এলডিসি উত্তরণ। জাতিসংঘ ২০২১ সালের ২৪
নভেম্বর বাংলাদেশকে ২০২৬ সালে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের সুপারিশ অনুমোদন করে।
এর অর্থ, ভবিষ্যতে
শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ও কিছু বিশেষ সুবিধা কমে যেতে পারে। তখন পণ্যের দামে
প্রতিযোগিতা করার পাশাপাশি সময়, নির্ভরযোগ্যতা, কমপ্লায়েন্স ও ট্রেসেবিলিটিতে
প্রতিযোগিতা করতে হবে।
এই জায়গায় পোশাক খাতের বাইরেও সুযোগ আছে। চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য, হিমায়িত মাছ, পাট, প্লাস্টিক
পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাত যদি আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী জায়গা করতে চায়, তাহলে শুধু
উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। দরকার ডিজিটাল সার্টিফিকেশন, উৎস
শনাক্তকরণ, মান
পরীক্ষার দ্রুততা, রপ্তানি
অনুমোদনের স্বচ্ছতা এবং ক্রেতার কাছে পণ্যের অবস্থান জানার সক্ষমতা। বিশেষ করে
খাদ্য ও কৃষিপণ্যে ট্রেসেবিলিটি এখন বিলাসিতা নয়; বাজারে প্রবেশের শর্ত হয়ে উঠছে।
বন্দর অবকাঠামোতেও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের ৮৫০
মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তির মধ্যে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার যাচ্ছে বে টার্মিনাল মেরিন
ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্পে। প্রকল্পে ৬ কিলোমিটার জলবায়ু-সহনশীল ব্রেকওয়াটার ও
অ্যাক্সেস চ্যানেল নির্মাণের কথা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বড় জাহাজ
ভেড়ার সুযোগ তৈরি হলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমবে, অর্থনীতির
দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ডলার সাশ্রয় হতে পারে এবং বে টার্মিনাল বাংলাদেশের কনটেইনার
ভলিউমের প্রায় ৩৬ শতাংশ সামলাতে পারবে।
কিন্তু অবকাঠামো একা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের দরকার তিন ধরনের সমান্তরাল
সংস্কার। প্রথমত, আইনগত
সংস্কার: ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং, ডিজিটাল স্বাক্ষর, ইলেকট্রনিক
ট্রান্সফারেবল রেকর্ড ও সীমান্তপারের তথ্য বিনিময়ের আইনি স্বীকৃতি স্পষ্ট করতে
হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক
সংস্কার: কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, বীমা, বাণিজ্য
মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, কৃষি, মৎস্য, ওষুধ
প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে ডেটা-সমন্বয় বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, বাজার
সংস্কার: শুধু বড় রপ্তানিকারক নয়, এসএমই, নারী উদ্যোক্তা ও জেলা পর্যায়ের উৎপাদকদের ডিজিটাল ট্রেড
ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আমরা ডিজিটাল বাণিজ্যকে “প্রকল্প” হিসেবে
দেখি, “প্রতিযোগিতা
সক্ষমতা” হিসেবে দেখি না। প্রকল্প শেষ হলে সার্ভার থাকে, কিন্তু
সংস্কৃতি বদলায় না। অথচ বিশ্ববাণিজ্যে এখন ক্রেতা জানতে চায় পণ্য কোথায়, কবে ছাড়বে, কাগজ ঠিক
আছে কি না, পরিবেশ
ও শ্রমমান মানা হয়েছে কি না, পেমেন্ট ঝুঁকি কতটা। এই প্রশ্নের উত্তর যদি দ্রুত ও
বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু কম দামের সরবরাহকারী থাকবে না; নির্ভরযোগ্য
বাণিজ্য অংশীদার হতে পারবে।
ডিজিটাল বাণিজ্যের অর্থ তাই মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়া নয়; বরং অদক্ষতা, দেরি ও
অস্বচ্ছতা কমানো। তবে এর সুফল পেতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ, আইনি কাঠামো, তথ্য
নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা লাগবে। বাংলাদেশের সামনে সময় খুব বেশি নেই।
এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য বাস্তবতা, জলবায়ু ঝুঁকি, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতার
কঠোর শর্ত মিলিয়ে আগামী দশক হবে কঠিন। কিন্তু এই কঠিন সময়েই সুযোগও বড়। কাগজ থেকে
ডেটায়, অনুমান
থেকে দৃশ্যমানতায়, বিচ্ছিন্ন
দপ্তর থেকে সংযুক্ত ব্যবস্থায় যেতে পারলে বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন
অধ্যায় শুরু হতে পারে।
লেখক পরিচিতি :
এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান
ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ
দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর









-medium.jpg)

০ টি মন্তব্য