https://powerinai.com/

সাম্প্রতিক খবর

বট যখন জনতার ছদ্মবেশ নেয়: বাংলাদেশের ডিজিটাল জনপরিসরের বাস্তবতা যাচাই জরুরি

বট যখন জনতার ছদ্মবেশ নেয়: বাংলাদেশের ডিজিটাল জনপরিসরের বাস্তবতা যাচাই জরুরি বট যখন জনতার ছদ্মবেশ নেয়: বাংলাদেশের ডিজিটাল জনপরিসরের বাস্তবতা যাচাই জরুরি
 

বাংলাদেশ গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ডিজিটাল রূপান্তরকে উন্নয়নের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছে। সরকারি সেবা অনলাইনে এসেছে, ব্যবসা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর হয়েছে, গণমাধ্যম ডিজিটাল পাঠকের ওপর নির্ভর করছে, আর সাধারণ মানুষ রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্ম, বিনোদন, বাজারদর, চাকরি ও সামাজিক অভিযোগ নিয়ে অনলাইনে কথা বলছে। কিন্তু এই ডিজিটাল জনপরিসর কতটা সত্যিকারের মানুষের কণ্ঠে গঠিত, আর কতটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রনির্ভর, সে প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেছেন, বাংলাদেশের অনলাইন সামাজিক ট্রাফিকের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট ট্রাফিক, প্রকৃত ব্যবহারকারীর কার্যক্রম নয়। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, সরকারি ও বেসরকারি ডেটা সুরক্ষায় বাংলাদেশের এখনো অনেক পথ যেতে হবে। বক্তব্যটি উদ্বেগজনক। তবে এটিকে ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করা দরকার। একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি মন্তব্য গুরুতর সতর্কসংকেত হতে পারে, কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নিরীক্ষার বিকল্প নয়। এখন প্রয়োজন স্বাধীন গবেষণা, প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক তথ্যপ্রকাশ, সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং জনস্বার্থে প্রমাণভিত্তিক আলোচনা।

বট ট্রাফিক বলতে ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের বদলে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামের মাধ্যমে তৈরি হওয়া কার্যক্রমকে বোঝায়। সব বট খারাপ নয়। সার্চ ইঞ্জিনের ক্রলার যেমন ওয়েবসাইটের তথ্য সূচিবদ্ধ করে মানুষকে তথ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। মনিটরিং বট ওয়েবসাইট চালু আছে কি না, তা পরীক্ষা করে। কিছু স্বয়ংক্রিয় টুল গবেষণা, সেবা ব্যবস্থাপনা বা তথ্য বিশ্লেষণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু ক্ষতিকর বট সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এগুলো ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে পারে, ভুয়া লাইক-শেয়ার-কমেন্ট বাড়াতে পারে, ডেটা স্ক্র্যাপ করতে পারে, পাসওয়ার্ড পরীক্ষা করে অ্যাকাউন্ট দখলের চেষ্টা করতে পারে, স্প্যাম ছড়াতে পারে, বিজ্ঞাপন জালিয়াতি করতে পারে এবং কখনো কখনো জনমতকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। এটি রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র, ব্যবসার বাজার, সংবাদমাধ্যমের পাঠকসংগ্রহের মাধ্যম, নাগরিক অভিযোগের জায়গা এবং অনেকের জন্য সামাজিক পরিচয়ের অংশ। এই পরিসরে যদি বড় অংশের ট্রাফিক স্বয়ংক্রিয় হয়, তবে আমাদের অনলাইন বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা ভুল হতে পারে।

আজ লাইক, শেয়ার, ভিউ, কমেন্ট, ফলোয়ার সংখ্যা, এনগেজমেন্ট রেট—এসবকে প্রায়ই জনমতের সূচক হিসেবে ধরা হয়। রাজনৈতিক দল এগুলো দেখে নিজের জনপ্রিয়তা বিচার করে। গণমাধ্যম এগুলো দেখে খবরের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনে টাকা ঢালে। নাগরিক সংগঠন ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের সাফল্য মাপে। সরকারি সংস্থা অনলাইন প্রতিক্রিয়া দেখে জনমত বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু এই সংখ্যার বড় অংশ যদি বট দ্বারা তৈরি হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে দূষিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।

এটি গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একটি সমন্বিত বট নেটওয়ার্ক প্রান্তিক কোনো মতামতকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত বলে দেখাতে পারে। কোনো সাংবাদিককে আক্রমণ করতে পারে। কোনো নারী অধিকারকর্মীকে অনলাইনে হয়রানির মুখে ফেলতে পারে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গুজব ছড়াতে পারে। কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে কৃত্রিম ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। আবার কোনো প্রকৃত নাগরিক ক্ষোভকে ভুয়া বলে সন্দেহের মুখেও ফেলতে পারে। দুই দিকেই বিপদ আছে।

বটের সমস্যা শুধু ভুয়া জনপ্রিয়তা নয়, ভুয়া শত্রুতাও। একজন সাংবাদিক যদি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শত শত আক্রমণাত্মক মন্তব্য পান, তিনি ভাবতে পারেন জনমত তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেছে। একজন নারী রাজনীতিক বা মানবাধিকারকর্মী সমন্বিত অনলাইন আক্রমণে চুপ হয়ে যেতে পারেন। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ভুয়া রিভিউর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কোনো গণপ্রতিষ্ঠান বট-চালিত প্রতিক্রিয়াকে প্রকৃত নাগরিক মতামত ধরে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এইভাবে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ক্ষমতার উপকরণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। অনেক সংবাদমাধ্যম এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর পাঠকপ্রবাহ ও বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যদি বট ট্রাফিক এই ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা নেয়, তাহলে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতে পারে। সংবেদনশীল, উত্তেজনাপূর্ণ বা বিভাজনমূলক কনটেন্ট যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি ছড়ানো হয়, তাহলে গুরুতর সাংবাদিকতা পিছিয়ে পড়বে। ভালো প্রতিবেদন কম দৃশ্যমান হবে, আর উত্তেজনানির্ভর বিষয় সামনে আসবে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, জনস্বার্থ সাংবাদিকতার সংকট।

বিজ্ঞাপন বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ভিউ, ক্লিক বা এনগেজমেন্টের জন্য টাকা দেয়, অথচ তার বড় অংশ বট-সৃষ্ট, তবে অর্থ অপচয় হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তারা প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনকে বিক্রির প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। তারা হয়তো দেখছে বিজ্ঞাপনে প্রচুর ক্লিক হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত ক্রেতা আসছে না। একই সমস্যা নাগরিক সমাজের প্রচারাভিযানেও হতে পারে। অনলাইনে প্রচার সফল দেখালেও তা বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

এর সঙ্গে আছে সাইবার নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন। ক্ষতিকর বট অনেক সময় ক্রেডেনশিয়াল স্টাফিং করে, অর্থাৎ অন্য কোথাও ফাঁস হওয়া ব্যবহারকারীর নাম ও পাসওয়ার্ড বিভিন্ন সাইটে পরীক্ষা করে। তারা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, ফর্মে ভুয়া তথ্য জমা দিতে পারে, সার্ভারকে অতিরিক্ত চাপ দিতে পারে, অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস বা এপিআই আক্রমণ করতে পারে এবং আর্থিক প্রতারণায় সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশ যখন ডিজিটাল সরকারি সেবা, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখন বট ট্রাফিক কেবল বিরক্তিকর প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্ন।

উপদেষ্টার ডেটা সুরক্ষা সম্পর্কিত সতর্কতাও তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। নাগরিকদের পরিচয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক ও ব্যক্তিগত তথ্য ক্রমেই ডিজিটাল ব্যবস্থায় জমা হচ্ছে। মানুষকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করতে, কিন্তু সেই সেবার ডেটা যদি নিরাপদ না থাকে, তবে ডিজিটাল রূপান্তর মানুষের ক্ষমতায়নের বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। ডিজিটাল আস্থা ভেঙে গেলে সেবা সম্প্রসারণও দুর্বল হবে।

বাংলাদেশের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অনলাইন সামাজিক ট্রাফিক যদি বট হয়, তাহলে জানতে হবে কোন প্ল্যাটফর্মে, কোন ধরনের ট্রাফিকে, কোন পদ্ধতিতে এই হিসাব করা হয়েছে। ভালো বট, খারাপ বট, বাণিজ্যিক বট, রাজনৈতিক বট, বিদেশি উৎসের বট, এআই-চালিত স্ক্র্যাপার, স্প্যাম অ্যাকাউন্ট এবং প্রকৃত ব্যবহারকারীর স্বয়ংক্রিয় টুল—সব এক করে দেখলে বিভ্রান্তি বাড়বে। তাই স্বাধীন জাতীয় বট ট্রাফিক মূল্যায়ন জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছ থেকে স্বচ্ছতা দাবি করতে হবে। বাংলাদেশ শুধু তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। দেশে কার্যরত বড় প্ল্যাটফর্মগুলোকে সমন্বিত ভুয়া আচরণ, ফেক এনগেজমেন্ট, বিজ্ঞাপন জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব অপারেশন, অনলাইন হয়রানি ও প্ল্যাটফর্ম নিরাপত্তা সম্পর্কে অর্থবহ তথ্য দিতে হবে। তবে এই প্রক্রিয়া হতে হবে অধিকারভিত্তিক। ভুয়া ট্রাফিকের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা যাবে না।

তৃতীয়ত, সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে যেন বট ট্রাফিকের যুক্তি অস্পষ্ট সেন্সরশিপের অস্ত্র না হয়। এটি বড় ঝুঁকি। যদি বলা হয় অনলাইনের বড় অংশ বট, তবে কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ প্রকৃত নাগরিক সমালোচনাকেও ভুয়া বলে উড়িয়ে দিতে চাইতে পারে। এটা গণতান্ত্রিকভাবে বিপজ্জনক। বট আছে মানে নাগরিক ক্ষোভ নেই, তা নয়। বট আছে মানে সব সমালোচনা কৃত্রিম, তা-ও নয়। বরং দরকার প্রমাণ, স্বচ্ছতা ও স্বাধীন যাচাই।

চতুর্থত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ফায়ারওয়াল, বট ডিটেকশন, রেট লিমিটিং, শক্তিশালী লগইন ব্যবস্থা, নিরাপদ এপিআই, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং গোপনীয়তা-সুরক্ষিত ডেটা ব্যবস্থাপনা জরুরি। Cloudflare, AWS Web Application Firewall বা অনুরূপ টুল সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়। দক্ষ জনবল, নীতিমালা, জবাবদিহি ও প্রশিক্ষণ সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, ডিজিটাল সাক্ষরতাকে নাগরিক শিক্ষার অংশ করতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, ট্রেন্ডিং মানেই সত্য নয়, ভাইরাল মানেই জনমত নয়, আর প্রতিটি কমেন্টের পেছনে মানুষ আছে, এমনও নয়। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি মিডিয়া, নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যম মানুষকে শেখাতে পারে কীভাবে ভুয়া এনগেজমেন্ট, ফিশিং, স্প্যাম, গুজব ও সমন্বিত অনলাইন আক্রমণ শনাক্ত করা যায়। ডিজিটাল সাক্ষরতা শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার শেখা নয়; ইন্টারনেট কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, সেটিও বোঝা।

ষষ্ঠত, নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে বট নেটওয়ার্ক, ভুয়া তথ্যপ্রবাহ, প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহি, অনলাইন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, রাজনৈতিক ম্যানিপুলেশন ও ডেটা সংগ্রহ নিয়ে জনস্বার্থে গবেষণা দরকার। এই কাজ শুধু সরকার বা বিদেশি প্ল্যাটফর্মের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ও প্রযুক্তিবিদদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জটি সূক্ষ্ম। ডিজিটাল পরিসর নিরাপদ করতে হবে, কিন্তু নাগরিক পরিসর বন্ধ করা যাবে না। ম্যানিপুলেশন ঠেকাতে হবে, কিন্তু বৈধ মতপ্রকাশ অপরাধী করা যাবে না। ডেটা সুরক্ষা করতে হবে, কিন্তু নজরদারি রাষ্ট্র তৈরি করা যাবে না। প্ল্যাটফর্মকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া যাবে না।

মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী ধরনের ডিজিটাল সমাজ গড়তে চায়। বট-ভরা ডিজিটাল জনপরিসর সত্যের চেয়ে শব্দকে, আলোচনার চেয়ে উত্তেজনাকে এবং বিশ্বাসের চেয়ে ম্যানিপুলেশনকে পুরস্কৃত করে। এতে নাগরিক জানতেই পারেন না, তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, না যন্ত্রের সঙ্গে। ব্যবসা নিজের তথ্য বিশ্বাস করতে পারে না। সরকার প্রকৃত জনমত বুঝতে পারে না। গণমাধ্যম তার পাঠক হারায় অ্যালগরিদমের ভিড়ে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর এখন শুধু সম্প্রসারণের নয়, সততা ও নিরাপত্তার পর্যায়ে প্রবেশ করতে হবে। বেশি ব্যবহারকারী, বেশি অ্যাপ, বেশি ডেটা এবং বেশি প্ল্যাটফর্ম হলেই শক্তিশালী ডিজিটাল সমাজ তৈরি হয় না। আস্থা, জবাবদিহি, নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার ছাড়া ডিজিটাল রূপান্তর ভঙ্গুর।

উপদেষ্টার বক্তব্য তাই এক দিনের সংবাদ হয়ে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। যদি সত্যিই বাংলাদেশের অনলাইন সামাজিক ট্রাফিকের বড় অংশ বটনির্ভর হয়, তবে জাতীয়ভাবে উত্তর খোঁজা জরুরি। কে মাপছে? কী মাপছে? কোন প্ল্যাটফর্ম বেশি আক্রান্ত? রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, বিদেশি বা এআই-চালিত নেটওয়ার্কের ভূমিকা কী? নারী, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু ও তরুণেরা কীভাবে আক্রান্ত হচ্ছে? ভুয়া এনগেজমেন্ট ও বিজ্ঞাপন জালিয়াতিতে কত অর্থ নষ্ট হচ্ছে?

বট সমস্যা শুধু যন্ত্রের সমস্যা নয়। এটি ক্ষমতা, মুনাফা, নিরাপত্তা ও আস্থার সমস্যা। বাংলাদেশ যদি এটিকে জনস্বার্থ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে দেখে, তবে সমাধানের পথ তৈরি হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক ডিজিটাল পরিসর, যেখানে নাগরিক কথা বলতে পারবেন, ব্যবসা সততার সঙ্গে কাজ করতে পারবে, সাংবাদিকতা তথ্যের ওপর দাঁড়াবে, প্রতিষ্ঠান জবাবদিহি করবে এবং মানুষের ডেটা সুরক্ষিত থাকবে।

কৃত্রিম ট্রাফিকের ওপর কোনো দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশের দরকার বাস্তব মানুষ, বাস্তব আস্থা এবং বাস্তব জবাবদিহি।  








০ টি মন্তব্য



মতামত দিন

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার মতামতটি দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।







পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? পুনরায় রিসেট করুন






রিভিউ

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার রিভিউ দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।