বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল সমাজে পরিণত হচ্ছে। ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি পরামর্শ, গণমাধ্যম, দুর্যোগ সতর্কতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাসী আয়, পরিবহন, এমনকি মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কও এখন অনেকাংশে ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। আমরা প্রায়ই এই রূপান্তরকে অগ্রগতি হিসেবে দেখি। সেটি অবশ্যই অগ্রগতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ডিজিটাল ব্যবস্থা যদি একসঙ্গে বা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?
সাধারণত ডিজিটাল ঝুঁকি বলতে আমরা সাইবার হামলা, ডেটা চুরি, হ্যাকিং, ভুয়া তথ্য বা অনলাইন প্রতারণার কথা ভাবি। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। কিন্তু আরও কিছু ঝুঁকি আছে, যেগুলো ইচ্ছাকৃত আক্রমণ না হয়েও বড় ধরনের জাতীয় সংকট তৈরি করতে পারে। যেমন সৌরঝড় বা স্পেস ওয়েদার, সাবমেরিন কেবল কাটা পড়া, স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিঘ্ন, ডেটা সেন্টার অচল হওয়া, বিদ্যুৎ বিপর্যয়, ঘূর্ণিঝড়-বন্যা-জলোচ্ছ্বাসে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, অথবা এক খাতের ব্যর্থতা আরেক খাতে ছড়িয়ে পড়া। এসব ঝুঁকি আলাদা ঘটনা হিসেবে শুরু হলেও দ্রুত জ্বালানি, ব্যাংকিং, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একসঙ্গে চাপে ফেলতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেকে “ডিজিটাল প্যানডেমিক” বা ডিজিটাল মহামারির সঙ্গে তুলনা করেন। কারণ এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে থাকে না। যেমন, একটি সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ইন্টারনেট ধীর হয় না; ব্যাংকিং লেনদেন, অনলাইন ব্যবসা, সংবাদপ্রবাহ, সরকারি সেবা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, আউটসোর্সিং, শিক্ষা ও জরুরি সেবাও প্রভাবিত হতে পারে। আবার বড় সৌরঝড় স্যাটেলাইট, জিপিএস, বিদ্যুৎ গ্রিড ও যোগাযোগব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে। চরম আবহাওয়ায় মোবাইল টাওয়ার, ফাইবার অপটিক লাইন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও স্থানীয় প্রশাসনিক যোগাযোগ একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুর্যোগ মোকাবিলাই দুর্বল হয়ে যায়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও জরুরি। আমরা জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টির অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। একই সঙ্গে আমরা ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে দ্রুত এগিয়েছি। এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে বিবেচনা না করলে বড় ভুল হবে। একটি উপকূলীয় জেলায় ঘূর্ণিঝড়ের সময় যদি বিদ্যুৎ থাকে না, মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয় এবং স্যাটেলাইট বা বেতার বিকল্পও প্রস্তুত না থাকে, তাহলে মানুষ শুধু তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে না; উদ্ধার, ত্রাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ও বিপর্যস্ত হবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এটি আন্তঃনির্ভর। টেলিযোগাযোগ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংকিং ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। জরুরি সেবা মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। সংবাদমাধ্যম সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ও ডেটা সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি সেবা সার্ভার, ডেটা সেন্টার ও পরিচয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এক জায়গায় ব্যর্থতা ঘটলে তার ঢেউ অন্য জায়গায় পৌঁছায়। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি এখনো অনেকাংশে খাতভিত্তিক। বিদ্যুৎ বিভাগ নিজের ঝুঁকি দেখে, টেলিযোগাযোগ খাত নিজের ঝুঁকি দেখে, ব্যাংকিং খাত নিজের ঝুঁকি দেখে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিজের ঝুঁকি দেখে। অথচ সংকট আসলে খাত আলাদা করে আসে না।
প্রথম প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ। বাংলাদেশে কোন ডিজিটাল অবকাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোন সেবা কোন নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল, কোন জেলায় কোন ধরনের দুর্বলতা বেশি, কোন সিস্টেম অচল হলে কী কী ধারাবাহিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে—এসব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিরপেক্ষ ও নিয়মিত মূল্যায়ন দরকার। শুধু কেন্দ্রীয় দপ্তরে নয়, জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এই মানচিত্র প্রয়োজন। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাস্তবতায় সব তথ্য সব সময় সহজলভ্য হয় না। তবু তথ্যের ঘাটতি দেখিয়ে প্রস্তুতি স্থগিত রাখা যাবে না।
দ্বিতীয় প্রয়োজন ব্যবস্থাপনা কাঠামো হালনাগাদ করা। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অনেক অভিজ্ঞ। কিন্তু ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যর্থতাকে এখনো অনেক সময় মূল ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয় না। সাইবার নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব ডিজিটাল বিপর্যয় সাইবার হামলা নয়। সৌরঝড়, কেবল বিচ্ছিন্নতা, স্যাটেলাইট বিঘ্ন বা ডেটা সেন্টার অচল হওয়া ইচ্ছাকৃত আক্রমণ না হয়েও জাতীয় ঝুঁকি হতে পারে। তাই আইনি সংজ্ঞা, জরুরি সাড়া দেওয়ার প্রটোকল, খাতভিত্তিক দায়িত্ব এবং জনসচেতনতা নতুনভাবে সাজাতে হবে।
তৃতীয় প্রয়োজন বিকল্প ব্যবস্থা। পুরো সমাজ যদি শুধু ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে, আর কোনো অ্যানালগ বিকল্প না থাকে, তবে সংকটের সময় অচলাবস্থা তৈরি হবে। হাসপাতাল, ব্যাংক, স্থানীয় প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম, বিদ্যুৎ, পানি, খাদ্য সরবরাহ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার হাতে জরুরি অ্যানালগ বা অফলাইন পদ্ধতি থাকতে হবে। কাগুজে রেজিস্টার, বেতার যোগাযোগ, স্থানীয় বার্তাবাহক ব্যবস্থা, কমিউনিটি রেডিও, সাইরেন, মাইকিং, স্যাটেলাইট ফোন, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ও স্থানীয় সমন্বয়ক দল—এসব পুরোনো মনে হলেও সংকটের সময় এগুলোই জীবন বাঁচাতে পারে।
চতুর্থ প্রয়োজন যৌথ মহড়া ও দৃশ্যপট পরিকল্পনা। শুধু কাগজে পরিকল্পনা থাকলেই হবে না। ধরে নিতে হবে, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যর্থতা, ইন্টারনেট ধীরগতি, ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ এবং দুর্যোগ সতর্কতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তখন কে কী করবে? বিকল্প যোগাযোগ কোথায়? কোন তথ্য আগে যাবে? স্থানীয় প্রশাসন কীভাবে কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকবে? হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র কীভাবে চালু থাকবে? ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবা সাময়িকভাবে কীভাবে পরিচালিত হবে? এসব নিয়ে নিয়মিত মহড়া দরকার। বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম ও স্থানীয় সরকারকে একই টেবিলে বসতে হবে।
পঞ্চম প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর ওপর আগাম সমন্বয়। স্পেস ওয়েদার বা সৌরঝড় নিয়ে বাংলাদেশে জনআলোচনা খুব কম। অথচ স্যাটেলাইট, জিপিএস, বিদ্যুৎ গ্রিড ও যোগাযোগব্যবস্থা এর প্রভাবের বাইরে নয়। সাবমেরিন কেবলও আমাদের আন্তর্জাতিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেগুলোর বিকল্প পথ, রুট বৈচিত্র্য, মেরামত সক্ষমতা ও জরুরি ব্যান্ডউইডথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে খোলামেলা প্রস্তুতি দরকার। স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ডেটা সেন্টার নিরাপত্তা, ক্লাউড নির্ভরতা এবং সরকারি ডেটা কোথায় রাখা হচ্ছে, এসব প্রশ্নও জনস্বার্থের।
ষষ্ঠ প্রয়োজন সামাজিক সহনশীলতা। ডিজিটাল বিপর্যয় শুধু প্রযুক্তিবিদদের সমস্যা নয়। সাধারণ মানুষ যদি জানে না কী করতে হবে, গুজব দ্রুত ছড়াবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে মানুষ কোথায় তথ্য পাবে? অনলাইন ব্যাংকিং বন্ধ হলে জরুরি লেনদেন কীভাবে হবে? দুর্যোগের সময় ইন্টারনেট না থাকলে পরিবার কীভাবে যোগাযোগ রাখবে? এসব বিষয়ে জনগণকে প্রস্তুত করতে হবে। স্কুল, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, কমিউনিটি রেডিও, স্থানীয় গণমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনকে যুক্ত করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে কমিউনিটি যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্ব নতুন করে ভাবা দরকার। দুর্যোগের সময় স্থানীয় ভাষায়, স্থানীয় মানুষের কাছে, বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে তথ্য পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। শুধু মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট যথেষ্ট নয়। কারণ সংকটের সময় যাদের সবচেয়ে বেশি তথ্য দরকার, তাদের অনেকেই হয়তো স্মার্টফোন, ডেটা প্যাক বা বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই ডিজিটাল প্রস্তুতির সঙ্গে কমিউনিটি যোগাযোগ ও অ্যানালগ সক্ষমতাকে একসঙ্গে রাখতে হবে।
বিশ্বাসও একটি বড় বিষয়। সংকটের সময় মানুষ যদি সরকারি তথ্য বিশ্বাস না করে, অথবা প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য ভেসে বেড়ায়, তবে প্রযুক্তিগত সমস্যা সামাজিক বিশৃঙ্খলায় রূপ নিতে পারে। তাই জাতীয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি অপারেটর, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও কমিউনিটির মধ্যে আগেই বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সংকটের দিনে নতুন করে আস্থা গড়া যায় না; সেটি আগে থেকেই তৈরি রাখতে হয়।
বাংলাদেশের সামনে তাই কাজ স্পষ্ট। প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ঝুঁকির জাতীয় তালিকা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খাতভিত্তিক নির্ভরতার মানচিত্র তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, অ-ইচ্ছাকৃত ডিজিটাল বিপর্যয়কে দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল অংশ করতে হবে। চতুর্থত, অ্যানালগ বিকল্প ও ব্যাকআপ যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। পঞ্চমত, সাবমেরিন কেবল, স্যাটেলাইট, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ নিয়ে যৌথ মহড়া চালু করতে হবে। ষষ্ঠত, নাগরিক ও স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্মার্ট বাংলাদেশ হওয়ার কথা বলছে। কিন্তু স্মার্ট হওয়ার অর্থ শুধু আরও অ্যাপ, আরও ডেটা, আরও অনলাইন সেবা নয়। স্মার্ট হওয়ার অর্থ হলো ঝুঁকি বোঝা, ব্যর্থতার জন্য প্রস্তুত থাকা এবং মানুষের জীবনের ওপর প্রযুক্তির প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া। যে ব্যবস্থার ব্যাকআপ নেই, যে সমাজ অ্যানালগ দক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে, যে প্রশাসন খাতভিত্তিক দেওয়ালে আটকে আছে এবং যে নাগরিক জানে না সংকটে কী করতে হবে—সেই ডিজিটাল ব্যবস্থা যত আধুনিকই দেখাক, ভেতরে ভঙ্গুর।
সৌরঝড়, সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্নতা, স্যাটেলাইট বিঘ্ন বা চরম আবহাওয়া হয়তো প্রতিদিন ঘটে না। কিন্তু প্রস্তুতি না থাকলে একবারের বড় ব্যর্থতাই বহু বছরের আস্থা নষ্ট করতে পারে। তাই ডিজিটাল ঝুঁকিকে ভবিষ্যতের সমস্যা ভাবার সময় শেষ। এটি বর্তমানের নীতি, নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের প্রশ্ন।
বাংলাদেশকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: আমরা কি ডিজিটাল ব্যবস্থাকে শুধু উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখব, নাকি তাকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু অপরিহার্য জন-অবকাঠামো হিসেবে সুরক্ষিত করব? উত্তরটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিজিটাল ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ক্ষতি শুধু ডেটার হবে না; ক্ষতি হবে মানুষের জীবন, জীবিকা, আস্থা ও সামাজিক স্থিতির।




.jpg)



০ টি মন্তব্য