https://powerinai.com/

সাম্প্রতিক খবর

ড. মঈন খানের উদ্যোগে WSIS ঢাকা সম্মেলনে আমার অন্তর্ভুক্তি

ড. মঈন খানের উদ্যোগে WSIS ঢাকা সম্মেলনে আমার অন্তর্ভুক্তি ড. মঈন খানের উদ্যোগে WSIS ঢাকা সম্মেলনে আমার অন্তর্ভুক্তি
 

জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কেবল স্মৃতি হয়ে থাকে না, হৃদয়ের গভীরে নীরব আর্তনাদের মতো রয়ে যায়। সময় অনেক দূর এগিয়ে যায়, মানুষ নতুন ব্যস্ততায় ডুবে যায়, চারপাশে নতুন ইতিহাস লেখা হয়, তবু কিছু কিছু দিনের ব্যথা, কিছু কিছু বিকেলের নীরবতা, কিছু কিছু ঘটনার আলো-ছায়া মুছে যায় না। ২০০৫ সালের একটি দিন আমার কাছে তেমনই এক স্মৃতি, যা আজও মনে পড়লে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপন জেগে ওঠে।

সেই সময় বাংলাদেশ বিশ্ব তথ্য সমাজ শীর্ষ সম্মেলন, অর্থাৎ WSIS-এর দ্বিতীয় পর্বকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নভেম্বর মাসে তিউনিসে বসবে সেই বৈশ্বিক সম্মেলন। তার আগে ঢাকায় আয়োজন করা হয়েছিল জাতীয় প্রস্তুতি সম্মেলন, “Dhaka: Road to Tunis”। বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে, মাননীয় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে এই আয়োজনটি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক পর্ব। দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ, তথ্যসমাজ গঠনের স্বপ্ন, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর, সবকিছুর সঙ্গে এই আয়োজনের গভীর সম্পর্ক ছিল।

আমার জন্য এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি সম্মেলন ছিল না। এটি ছিল আমার বিশ্বাসের অংশ, আমার শ্রমের অংশ, আমার আত্মনিবেদনের অংশ। ২০০২ সাল থেকেই আমি Bangladesh Working Group on WSIS-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এই যাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। WSIS আমার কাছে শুধু প্রযুক্তির আলোচনা ছিল না; এটি ছিল মানুষের যোগাযোগ অধিকার, অন্তর্ভুক্তি, উন্নয়ন, ন্যায্যতা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের এক নতুন কল্পনার নাম।

তাই যখন “ঢাকা: রোড টু টিউনিস” সম্মেলনের মাত্র দুই-তিন দিন আগে জানতে পারলাম, কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ আমাকে এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়েছে, তখন ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। সেই বেদনা ভাষায় বলা সহজ নয়। মনে হয়েছিল, কেউ যেন শুধু আমাকে নয়, আমার দীর্ঘদিনের পথচলা, আমার নিষ্ঠা, আমার নির্ঘুম সময়, আমার বিশ্বাস, সবকিছুকেই অস্বীকার করতে চাইছে। সেই মুহূর্তে আমি খুব নিঃসঙ্গ বোধ করেছিলাম।

মানুষের জীবনে কিছু কিছু অপমান থাকে, যা উচ্চস্বরে প্রতিবাদ ডাকে না, বরং নীরবে চোখ ভিজিয়ে দেয়। সেই দিন আমারও ঠিক তেমনই লেগেছিল। বাইরে থেকে হয়তো আমি স্থির ছিলাম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি আহত হচ্ছিলাম। অনেক বছরের শ্রম কি তাহলে এত সহজে উপেক্ষিত হতে পারে? একজন মানুষকে কি সত্যিই এত সহজে মুছে ফেলা যায়? এমন অনেক প্রশ্ন বুকের ভেতর জেগে উঠছিল।

কিন্তু কষ্টের মধ্যেও আমি নিজের ভরসা হারাইনি। আমি জানতাম, ক্ষোভ নয়, সত্যই আমার একমাত্র আশ্রয়। তাই দ্রুত WSIS প্রক্রিয়ায় আমার সম্পৃক্ততার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখে মাননীয় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানের কাছে পাঠালাম। সেখানে আমি কোনো তিক্ত ভাষা ব্যবহার করিনি। কাউকে দোষারোপ করিনি। শুধু আমার কাজের কথা বলেছি, আমার ভূমিকার কথা বলেছি, এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সত্যটুকু তুলে ধরেছি।

সত্যি বলতে কী, খুব বেশি আশা নিয়ে আমি সেটি পাঠাইনি। অনেক সময় মানুষ চিঠি লেখে উত্তর পাওয়ার আশায় নয়, নিজের ভেতরের সত্যটুকুকে নথিভুক্ত করার জন্য। আমার অবস্থাও ছিল তেমন। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা আজও আমার কাছে নীরব করুণা আর ন্যায়বোধের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে।

অল্প সময়ের মধ্যেই মন্ত্রণালয় থেকে একটি ফোন এল। একজন অতিরিক্ত সচিব জানালেন, তিনি মাননীয় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করছেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল আন্তরিকতা, আর সংবাদে ছিল এমন এক সম্মান, যা আমি সেই মুহূর্তে হয়তো কল্পনাও করিনি। তিনি আমাকে শুধু সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন না, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে বক্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানালেন। পরে জানতে পারি, সেই অধিবেশনটি পরিচালনা করেছিলেন ব্র্যাকের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক জনাব আবদুল মুইদ চৌধুরী।

ফোনটি রাখার পর আমি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে ছিলাম। আজও সেই মুহূর্ত মনে পড়লে চোখ ভিজে আসে। কারণ সেটি কেবল একটি আমন্ত্রণ ছিল না। সেটি ছিল আমার অস্তিত্বকে স্বীকার করার একটি হাতছানি। যেন কেউ আমাকে বলছে, “না, তোমার পথচলা বৃথা যায়নি; তোমার শ্রমকে আমরা দেখেছি; তোমার অবদানকে আমরা অস্বীকার করিনি।”

জীবনে মানুষ সবসময় বড় বড় পুরস্কারে কাঁদে না। কখনো কখনো কাঁদে একটি ন্যায়সঙ্গত স্বীকৃতিতে। কাঁদে এই ভেবে যে, অন্ধকারের ভেতরেও কেউ একজন সত্যকে চিনেছে। সেই দিন আমার ভেতরে ঠিক এমনই এক আবেগের ঢেউ উঠেছিল। মনে হয়েছিল, দীর্ঘ অপমানের পর কেউ খুব শান্তভাবে এসে আমার কাঁধে হাত রেখেছে।

ড. আব্দুল মঈন খানের প্রতি আমার শ্রদ্ধার একটি বড় ভিত্তি এই ঘটনাই। তিনি শুধু একজন মন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি দায়িত্বের আড়ালে মানবিক ন্যায়বোধকে হারিয়ে ফেলেননি। নেতৃত্বের আসল সৌন্দর্য এখানেই, যেখানে ব্যক্তি-স্বার্থ, গোষ্ঠী-প্রভাব, কিংবা গোপন চাপের ঊর্ধ্বে উঠে একজন নেতা মানুষের যোগ্যতা ও অবদানকে মর্যাদা দেন। তিনি সেটিই করেছিলেন। আর এই কারণেই তাঁর সেই সিদ্ধান্ত আমার কাছে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এক মানবিক আলোকবর্তিকা।

সেই দিন আমি খুব গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম, মানুষকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের অবদানকে স্থায়ীভাবে মুছে দেওয়া যায় না। কিছু মানুষ আছে, যারা দরজা বন্ধ করে দিতে পারে; আবার কিছু মানুষ আছে, যারা একটি জানালা খুলে দিয়ে মানুষের জীবনে আলো ঢুকতে দেন। ড. আব্দুল মঈন খান আমার জীবনের সেই মুহূর্তে ঠিক তেমনই একটি জানালা খুলে দিয়েছিলেন।

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। সময় তার নিজস্ব গতিতে আমাকে আরও অনেক পথ দেখিয়েছে। WSIS প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ হয়নি; বরং আরও গভীর হয়েছে। আমি আজও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে WSIS+20 পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছি। BNNRC ২০১৬ সালে WSIS পুরস্কার অর্জন করেছে এবং ২০১৭, ২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে WSIS চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শুরু থেকেই WSIS ফোরামের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনগুলোতে বক্তা হিসেবে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে।

পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, যে মানুষগুলো একদিন আমাকে আড়াল করতে চেয়েছিল, তারা আজ ইতিহাসের প্রান্তে ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু যে মানুষটি ন্যায়কে চিনেছিলেন, অন্তর্ভুক্তির মূল্য বুঝেছিলেন, তাঁর একটি সিদ্ধান্ত আজও আমার স্মৃতিতে দীপের মতো জ্বলছে। এটাই হয়তো সময়ের সবচেয়ে কোমল বিচার।

আজও আমি মনে করি, ২০০৫ সালের সেই ঘটনাটি আমার জীবনে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি ছিল না। সেটি ছিল আমার বেদনাহত মনকে ফিরিয়ে দেওয়া মর্যাদা। সেটি ছিল নীরব কান্নার ভেতর একটি আলোর রেখা। সেটি ছিল এমন এক শিক্ষা, যা আমাকে আজও মনে করিয়ে দেয়, সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও, সত্যের জন্য কোথাও না কোথাও একটি দরজা খোলা থাকে।

ড. আব্দুল মঈন খান আমাকে বক্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু আমার কাছে তার চেয়েও বড় সত্য হলো, তিনি সেই দিন আমার দীর্ঘদিনের শ্রম, আমার নীরব কষ্ট, আমার আত্মমর্যাদা এবং আমার বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়েছিলেন।

কিছু কিছু স্মৃতি মানুষ শুধু মনে রাখে না, হৃদয়ে বহন করে।

২০০৫ সালের সেই দিনটি আমি তেমনই বহন করে চলেছি,

নীরবে, কৃতজ্ঞতায়, আর কখনো কখনো অশ্রুসজল চোখে।

এ এইচ এম বজলুর রহমান | ডিজিটাল গণতন্ত্র ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাম্বাসেডর | প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা |বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)| [email protected] | +8801711881647








০ টি মন্তব্য



মতামত দিন

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার মতামতটি দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।







পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? পুনরায় রিসেট করুন






রিভিউ

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার রিভিউ দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।