বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগ দ্রুত বিস্তৃত হলেও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ এখনো অসম ও ভঙ্গুর। ২০২৬ সালের “স্টেট অব ডিজিটাল” তথ্য বলছে, দেশে মোবাইল সংযোগ প্রায় সর্বব্যাপী হলেও জনসংখ্যার বড় অংশ অনলাইনের বাইরে রয়ে গেছে, এবং যারা অনলাইনে আছেন তাদেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ “ওয়েব” নয় বরং সীমিত কিছু প্ল্যাটফর্ম-নির্ভর তথ্যজগতে আবদ্ধ।
এই প্রেক্ষাপটে “বিনামূল্যে ইন্টারনেট”কে মানবাধিকার হিসেবে ভাবার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ন্যূনতম অপরিহার্য কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা, যাতে মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, সরকারি সেবা এবং মতপ্রকাশের অধিকার বাস্তবে চর্চা করতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, জবাবদিহি ও বৈষম্য-হ্রাসকে নীতির কেন্দ্রে না রাখলে “ফ্রি অ্যাক্সেস” অনেকের জন্য সুবিধার বদলে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
১. বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ডিজিটাল বাস্তবতা: অগ্রগতি, কিন্তু অসমতা
ডেটা রিপোর্টাল (DataReportal) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে ১৮৬ মিলিয়ন মোবাইল সংযোগ সক্রিয় ছিল (জনসংখ্যার ১০৫%-এর সমান), ৮২.৮ মিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছিলেন (প্রবেশহার ৪৭%), এবং অক্টোবর ২০২৫-এ ৬৪.০ মিলিয়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী পরিচয় ছিল (জনসংখ্যার ৩৬.৩%)।
একই উৎসে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইঙ্গিত আছে: ২০২৫ সালের শেষে আনুমানিক ৯৩.৪ মিলিয়ন মানুষ অফলাইনে ছিলেন।
এখানে একটি “কানেক্টিভিটি প্যারাডক্স” স্পষ্ট: সংযোগের সংখ্যা বেশি, কিন্তু অর্থবহ ইন্টারনেট ব্যবহারে সমাজ বিভক্ত। বহু মানুষ একাধিক সিম ব্যবহার করেন; বহু সংযোগ ভয়েস/এসএমএসে সীমিত থাকতে পারে; আবার স্মার্টফোন, ডেটা কেনার সামর্থ্য, নেটওয়ার্কের মান, বিদ্যুৎ এবং ডিজিটাল দক্ষতা মিলিয়ে বাস্তব প্রবেশাধিকার নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ “সংযোগ আছে” মানেই “অধিকার চর্চা সম্ভব” নয়।
২. ইন্টারনেট কেন মানবাধিকার আলোচনার কেন্দ্রে
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল ২০১২ সালে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে যে অফলাইনে যে অধিকার আছে, অনলাইনেও তা সুরক্ষিত থাকতে হবে, বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; এবং রাষ্ট্রসমূহকে ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার প্রসারে উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
এই অবস্থান বাস্তব অর্থে বলে: ইন্টারনেট নিজে “অধিকার” হতে পারে, আবার একই সঙ্গে এটি বহু অধিকারের প্রয়োগক্ষম অবকাঠামো। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরও তীব্রভাবে সত্য, কারণ শিক্ষা-পরীক্ষা, চাকরির আবেদন, সরকারি তথ্য-সেবা, স্বাস্থ্যপরামর্শ, দুর্যোগ সতর্কতা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বাজার সংযোগ ইত্যাদি ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে যাচ্ছে।
তবে একটি সতর্কতা জরুরি: “অধিকার” মানে শুধু অ্যাক্সেস নয়, বরং অর্থবহ, নিরাপদ, বৈষম্যহীন অ্যাক্সেস। নচেৎ “কাগজে অধিকার” থেকে যায়, বাস্তবে নাগাল পাওয়া যায় না।
৩. কেন “বিনামূল্যে” বলা জরুরি: বাংলাদেশি বাস্তবতায় প্রবেশাধিকার বনাম ব্যয়সামর্থ্য
বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা বাড়লেও ব্যয় বহনের ক্ষমতা সমান নয়। শিক্ষার্থী, দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক, গ্রামীণ নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে নিয়মিত ডেটা কেনা অনেক সময় ব্যয়সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত। এর ফলও পূর্বানুমেয়: অনলাইনে শেখা থামে, চাকরির আবেদন কঠিন হয়, টেলিমেডিসিন বা সরকারি সেবা পেতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা বাড়ে, এবং তথ্যের উৎস সোশ্যাল মিডিয়ার “ভাইরাল” প্রবাহে সংকুচিত হয়।
এখানে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়: বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়।
প্রবেশাধিকার সীমিত হলে মানুষ “ওয়েব” নয়, “প্ল্যাটফর্ম”-নির্ভর তথ্যজগতে আটকে যায়। এতে ভুলতথ্য, প্রতারণা, উসকানি এবং অনলাইন সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে, কারণ তথ্য যাচাই ও বহুমাত্রিক উৎসে যাওয়ার সক্ষমতা কমে।
তাই “বিনামূল্যে ইন্টারনেট”কে নীতিগতভাবে সংজ্ঞায়িত করা জরুরি: এটি অনন্ত ডেটা বা বিনোদনের নিশ্চয়তা নয়; বরং ন্যূনতম অপরিহার্য কানেক্টিভিটি। অর্থাৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সরকারি সেবা, জরুরি সতর্কতা, চাকরি/দক্ষতা প্ল্যাটফর্ম, অধিকার-তথ্য এবং নাগরিক অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় বেসলাইন অ্যাক্সেস।
৪. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি: লিঙ্গ, ভূগোল, প্রতিবন্ধিতা এবং তথ্য-নিরাপত্তা
ডেটা রিপোর্টাল অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী পরিচয়ের মধ্যে নারী ৩৬.৯%, পুরুষ ৬৩.১%।
এটি কেবল সংখ্যা নয়; এটি “ডিজিটাল নাগরিকত্বে” লিঙ্গভিত্তিক ফাঁক নির্দেশ করে। GSMA–এর তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাদেশে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মোবাইল ইন্টারনেট গ্রহণের হার কম দেখানো হয়েছে (উদাহরণ হিসেবে এক প্রতিবেদনে পুরুষ ৪০%, নারী ২৪%) এবং প্রধান বাধা হিসেবে ডিভাইস/সামর্থ্য ও দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কথা এসেছে।
এ ছাড়া শহর-গ্রাম বিভাজন বাস্তব: ২০২৫ সালের শেষদিকে জনসংখ্যার ৫৭.৮% গ্রামে বাস করতেন।
গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ ও ডিভাইস প্রবেশাধিকার অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলক দুর্বল থাকে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আবার কনটেন্ট ও সেবার অ্যাক্সেসিবিলিটি (স্ক্রিন রিডার-সাপোর্ট, সহজ ভাষা, স্থানীয় ভাষা, ভিজ্যুয়াল/অডিও বিকল্প) নিশ্চিত না হলে “অ্যাক্সেস” কাগজে থেকে যায়।UN-স্টাইল নীতি দৃষ্টিভঙ্গি এখানে পরিষ্কার: “সবার জন্য এক” কর্মসূচি নয়; বরং ন্যায্যতা-ভিত্তিক টার্গেটিং, নিরাপত্তা এবং সহায়তা কাঠামো।
৫. ঝুঁকি ও সুরক্ষা: ইন্টারনেট বন্ধ, জবাবদিহি, এবং আস্থার প্রশ্ন
ইন্টারনেটকে অধিকার হিসেবে মানতে হলে রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব হচ্ছে অনলাইন পরিসরে অধিকার চর্চাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যাহত না করা। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশব্যাপী ইন্টারনেট শাটডাউন ব্যবসা ও নাগরিক জীবনে বড় ধাক্কা দেয় বলে সংবাদে এসেছে। এটি শুধু “সেবা বিঘ্ন” নয়; অনেক অধিকার (তথ্য, মতপ্রকাশ, জীবিকা, জরুরি সেবা) একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ আইনে “ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা কোনো অবস্থায় বন্ধ/সীমিত করা যাবে না” এটি একটি ইতিবাচক দিক হতে পারে, তবে UN-স্টাইল মূল্যায়ন হবে শর্তসাপেক্ষ: বিধান বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, ব্যতিক্রমের সুযোগ আছে কি না, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও স্বাধীন তদারকি আছে কি না, এবং নাগরিক প্রতিকার ব্যবস্থা (remedy) কার্যকর কি না।
৬. নীতিগত পথনির্দেশ: “বিনামূল্যে ইন্টারনেট” কীভাবে বাস্তবায়নযোগ্য
মানবাধিকার হিসেবে বিনামূল্যে ইন্টারনেটকে বাংলাদেশে কার্যকর করতে হলে লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যূনতম অপরিহার্য কানেক্টিভিটি এবং অর্থবহ ব্যবহার। প্রস্তাবিত করণীয়:
৬.১ পাবলিক অ্যাক্সেস পয়েন্ট
• ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি সেন্টারে নিরাপদ পাবলিক ওয়াই-ফাই/কমিউনিটি নেটওয়ার্ক
• নারী, কিশোরী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ সময়/স্থান এবং সহায়তা ডেস্ক
৬.২ টার্গেটেড ভাউচার/সাবসিডি
• শিক্ষার্থী, নিম্নআয়ের পরিবার, নারীনেতৃত্বাধীন পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দুর্যোগ-প্রবণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য ন্যূনতম ডেটা প্যাক
• লক্ষ্য হবে “সবার জন্য বেসলাইন”, যাতে বাজার-ভিত্তিক অতিরিক্ত ব্যবহারের সুযোগ অক্ষুণ্ন থাকে
৬.৩ অপরিহার্য সেবায় শূন্য-খরচ প্রবেশ (Zero-cost access)
• সরকারি তথ্য, জরুরি সতর্কতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দিষ্ট রিসোর্সে শূন্য-খরচ প্রবেশ
• সতর্কতা: এটি যেন “কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম”কে সুবিধা দেয় এমন ওয়াল্ড-গার্ডেন (walled garden) না তৈরি করে; নেট নিরপেক্ষতা ও ব্যবহারকারীর পছন্দের নীতি বজায় রাখতে হবে
৬.৪ নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও শিশু সুরক্ষা
• অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধ, শিশু সুরক্ষা, ডেটা গোপনীয়তা ও স্বচ্ছ জবাবদিহি কাঠামো
• “ফ্রি অ্যাক্সেস” যেন নজরদারি/ডেটা শোষণের প্রণোদনা না বাড়ায়; আস্থা তৈরিই টেকসই ব্যবহারের শর্ত
৬.৫ ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসি
• ভুলতথ্য শনাক্ত, গোপনীয়তা রক্ষা, সাইবার প্রতারণা থেকে সুরক্ষা, এবং দায়িত্বশীল মতপ্রকাশের দক্ষতা
• বিশেষ গুরুত্ব: নারী ও তরুণদের নিরাপদ অনলাইন আচরণ, এবং গ্রামীণ এলাকায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ
৭. আপত্তি ও উত্তর: “ব্যয়বহুল, অপব্যবহার হবে”
এই আপত্তি অগ্রাহ্য করা যায় না। কিন্তু UN-স্টাইল নীতি বিশ্লেষণে প্রশ্ন হবে: ব্যয়টা কোথায়, আর লাভটা কোথায় জমা হয়? সংযুক্ত নাগরিক মানে শিক্ষা-অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, স্বাস্থ্যসেবায় লেনদেন খরচ কমা, দুর্যোগে ক্ষতি কমা, এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতার সম্ভাবনা। একই সঙ্গে অপব্যবহার কমাতে নীতিগত রক্ষাকবচ, ডিজিটাল লিটারেসি ও নিরাপত্তা কাঠামোকে “প্যাকেজ” হিসেবে নিতে হবে; অধিকারকে শর্তহীন করে ঝুঁকি বাড়ানো যেমন ভুল, তেমনি অপব্যবহারের আশঙ্কায় অধিকার অস্বীকার করাও অসংগত।
উপসংহার
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ডিজিটাল চিত্র দেখায়, দেশ একটি নীতিগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে: ইন্টারনেট কি কেবল বাজারের পণ্য থাকবে, নাকি ন্যূনতম স্তরে সবার জন্য নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। ডেটা রিপোর্টাল বলছে এখনও জনসংখ্যার বড় অংশ অফলাইনে; আবার অনলাইনে থাকা বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়া-কেন্দ্রিক।
এই বাস্তবতায় “বিনামূল্যে ইন্টারনেট”কে মানবাধিকার হিসেবে এগোনোর মানে হলো: ন্যূনতম অপরিহার্য কানেক্টিভিটি + অন্তর্ভুক্তি + নিরাপত্তা + জবাবদিহি। এবং সেটিই বাংলাদেশে মানবাধিকার ও উন্নয়নকে একইসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গণতন্ত্র বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাম্বাসেডর









০ টি মন্তব্য