তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সাফল্য ও অবারিত সম্ভাবনাকে দেশ-বিদেশের সামনে তুলে ধরা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত দেশের সর্ব
বৃহৎ তথ্যপ্রযুক্তি প্রদর্শনী ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’ উদ্বোধন করেছেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
আজ ২৮ জানুয়ারি (বুধবার) প্রধান অতিথি হিসেবে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চার দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা।
প্রদর্শনীটি যৌথভাবে আয়োজন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান বলেন, তিন দিনব্যাপী এই এক্সপো শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, এটি বাংলাদেশের সক্ষমতার এক সুদূরপ্রসারী অঙ্গীকার। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে জানাতে চাই-বাংলাদেশ এখন আর কেবল সস্তা শ্রম বা আউটসোর্সিংয়ের দেশ নয়, আমরা এখন বিশ্বমানের ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন ও উচ্চপ্রযুক্তির উদ্ভাবক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছি।
জাতীয় উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে আইসিটি খাত আর কেবল অন্য কোনো খাতের সহায়তাকারী নয়, এটি এখন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু, শিল্পায়নের চালিকাশক্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার মেরুদণ্ড। আমরা এখন ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির দিকে এগোচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডেটা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্লকচেইন, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, রোবোটিক্স এবং গ্রিন টেকনোলজির মতো বিষয়গুলো আমাদের অর্থনীতিকে দেবে নতুন গভীরতা ও নতুন নেতৃত্ব।
প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বাস করে, তথ্যপ্রযুক্তিই বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই আমাদের লক্ষ্য কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তব কাজ ও ফলাফলে। দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদন বাড়িয়ে মোবাইল ডিভাইস, সফটওয়্যার, আইওটি ও এমবেডেড সিস্টেমে আত্মনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমানো ও তরুণদের জন্য উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ রেজিস্ট্রেশন, কর ছাড়, নীতিগত সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় রেখে এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, ব্লকচেইন, ক্লাউড ও রোবোটিক্সে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা হচ্ছে। ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ, হাই-টেক পার্ক ও ইনোভেশন হাবের কার্যকর ব্যবহার এবং “ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬”-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, এনডিসি বলেন, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ধারাবাহিক নীতিগত উদ্যোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গঠনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রয়েছে। আইসিটি বিভাগ বিশ্বাস করে-প্রযুক্তি শুধু একটি আলাদা খাত নয়, বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও প্রশাসনসহ প্রতিটি উন্নয়ন ক্ষেত্রের মূল চালিকাশক্তি।
তিনি বলেন, আইসিটি বিভাগের নেতৃত্বে আমরা ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়ন, হাই-টেক পার্ক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রতিষ্ঠা, স্টার্টআপ ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা এবং তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছি। এর ফলে আজ বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করছে না, বরং বৈশ্বিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, আজকের দিনটি শুধু একটি আয়োজনের নয়, এটি একটি সময়ের সাক্ষী। এমন এক মুহূর্তে আমরা একত্রিত হয়েছি, যখন বাংলাদেশ নতুন করে নিজের স্বপ্ন দেখে, নিজের মূল্যবোধে আস্থা রাখে এবং ভবিষ্যৎকে সাহসের সঙ্গে গড়ে তুলতে এগিয়ে যায়। ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের যে জাগরণ আমরা অনুভব করছি, “ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬” তারই প্রাণবন্ত প্রকাশ।
তিনি বলেন, এই এক্সপো আমাদের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশ আর কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বাংলাদেশ আজ প্রযুক্তির নির্মাতা, উদ্ভাবনের কারিগর এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার। এখানে আমরা দেখি, আমাদের তরুণেরা কোডে ভবিষ্যৎ লেখে, হার্ডওয়্যারে সক্ষমতা গড়ে তোলে, ডেটায় সিদ্ধান্ত নেয় এবং উদ্ভাবনের শক্তিতে বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে দেয়। আজকের এই মঞ্চ আমাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে। প্রযুক্তি বিলাসিতা নয়, প্রযুক্তিই অর্থনৈতিক মুক্তির পথ এবং ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, এই এক্সপোতে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং দেশীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে সময়োপযোগী জ্ঞানভিত্তিক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্মার্ট ডিভাইস, ফিনটেক, হেলথটেক, এডুটেক ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-কেন্দ্রিক দেশীয় প্রযুক্তি পণ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্ভাবনের সক্ষমতা তুলে ধরা হচ্ছে। এই এক্সপো জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইসিটি খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, তরুণদের অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, আইডিয়া প্রকল্প এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি, আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিবৃন্দ, দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, সরকারি ও বেসরকারি ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি, ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধান উপদেষ্টা মেলায় স্টল ও প্যাভেলিয়ন ঘুরে দেখেন।
আয়োজকরা জানান, প্রথম দিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রদর্শনী রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। অন্যান্য দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রদর্শনীতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও অনলাইনে (www.ddiexpo.com.bd) অথবা স্পট রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে।
মেলায় বিভিন্ন পণ্যে ছাড় ও অফারের বিষয়ে জানানো হয়, কম্পিউটারের পাশাপাশি ৪০ শতাংশ ব্র্যান্ড ফোনে ছাড় পাবেন গ্রাহক। দেখা দিতে পারে স্যামসাং এর তিন ভাঁজের স্মার্টফোন। অনার আনছে ডিপ ফেইক ভিপ ফেইক ভিডিও শনাক্তের ডিভাইস আনছে অনার। শাওমি ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ও ১০ হাজার টাকা সমমূল্যের উপহার। ভাগ্যবানদের জন্য লেনেভো দেবে ই-বাইক।
এক্সপোতে থাকবে ইনোভেশন জোন, ডিজিটাল ডিভাইস জোন, মোবাইল জোন, ই-স্পোর্টস জোন এবং বিটুবি জোন। ডিজিটাল ডিভাইস জোন এবং মোবাইল জোনে পছন্দমত পণ্য ক্রয়ের সুযোগ।
প্রদর্শনী চলাকালে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ৫টি সেমিনার এবং ৪টি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
সেমিনারে দেশের বরেণ্য তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করবেন। প্রতিদিনই থাকবে বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের বিশেষায়িত প্রদর্শনী ও কুইজ প্রতিযোগিতা।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের আওতায় থাকবে, যা দর্শনার্থীদের এই অত্যাধুনিক ইন্টারনেট প্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে।
চার দিনের প্রদর্শনীতে গোল্ড স্পন্সর হিসেবে থাকছে ইপসন, অনর, এইচপি, লেনোভো, অপো, স্যামসাং, টেকনো ও শাওমি। সিলভার স্পন্সর হিসেবে থাকছে এসার, গিগাবাইট, নেটিস, টিপি-লিংক ও ইউসিসি। এছাড়া স্টারলিংক পার্টনার হিসেবে থাকছে স্টারলিংক ফিলিসিটি আইডিসি।
সহযোগিতায় থাকবে বাংলাদেশ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি), ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব), বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরাম (বিআইজেএফ) এবং টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ড বাংলাদেশ (টিএমজিবি)।









০ টি মন্তব্য