https://powerinai.com/

সাম্প্রতিক খবর

ডার্ক ওয়েবে ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি: কতটা সত্য, কতটা ঝুঁকি?

ডার্ক ওয়েবে ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি: কতটা সত্য, কতটা ঝুঁকি? ডার্ক ওয়েবে ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি: কতটা সত্য, কতটা ঝুঁকি?
 

গতকাল রোববার প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত একটি সংবাদ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ডার্ক ওয়েবে ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি বিক্রির বিজ্ঞাপন’। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ম্যাডরক্স’ নামে পরিচয় দেওয়া একটি হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ডার্ক ফোরামস ডট আর ইউ’ নামের একটি ওয়েবসাইটে ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। তাদের দাবি, এসব তথ্য দেশের জনপ্রিয় চাকরির প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসের ডেটাবেজ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

তবে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে কোনো তথ্য ফাঁস হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে বিডিজবস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তাকে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবহারকারীর প্রোফাইল কে দেখতে পারবেন এবং কারা দেখতে পারবেন না, সে বিষয়েও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—হ্যাকারদের এই দাবি কতটা সত্য? সত্যিই কি ৬০ লাখ মানুষের সিভি তাদের হাতে পৌঁছেছে, নাকি এটি শুধু ভয় দেখানো কিংবা প্রতারণার উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি ভুয়া বিজ্ঞাপন? বিষয়টি নিশ্চিত হতে প্রয়োজন স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই ও প্রযুক্তিগত তদন্ত।

ডার্ক ওয়েব আসলে কী?

ইন্টারনেটকে সাধারণভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করে বোঝানো যায়—সারফেস ওয়েব, ডিপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েব।

সারফেস ওয়েব হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ, যা আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট, ইউটিউব, ফেসবুক, গুগলসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইট সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়।

ডিপ ওয়েব হলো এমন অনলাইন কনটেন্ট, যা সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে ইনডেক্স করা থাকে না। ব্যক্তিগত ই-মেইল ইনবক্স, অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ডেটাবেজ এর উদাহরণ। ডিপ ওয়েব নিজে কোনো অবৈধ বিষয় নয়।

অন্যদিকে, ডার্ক ওয়েব হলো ডিপ ওয়েবের একটি ছোট ও ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা অংশ। এখানে প্রবেশের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার বা নেটওয়ার্ক প্রয়োজন হয়।

ডার্ক ওয়েবে কী পাওয়া যায়?

ডার্ক ওয়েবের সবকিছুই অবৈধ নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, সেন্সরশিপ এড়িয়ে তথ্য আদান-প্রদান, সাংবাদিক ও তথ্যদাতার নিরাপদ যোগাযোগসহ বৈধ কাজেও এর ব্যবহার রয়েছে।

তবে ডার্ক ওয়েবের সবচেয়ে বেশি আলোচিত দিক হলো এর অবৈধ মার্কেটগুলো। বিভিন্ন সময়ে এখানে মাদক, চুরি করা ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, আর্থিক তথ্য, জাল নথি, ভুয়া পরিচয়পত্র এবং বিভিন্ন অবৈধ সেবা কেনাবেচার তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ডার্ক ওয়েবে প্রকাশিত প্রতিটি বিজ্ঞাপন যে সত্যি, এমন নয়। সেখানে প্রতারণা, ভুয়া বিক্রেতা ও মিথ্যা তথ্যের ঘটনাও ব্যাপক।

টর কীভাবে ডার্ক ওয়েবের সঙ্গে যুক্ত?

ডার্ক ওয়েব ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো টর বা ‘দ্য অনিয়ন রাউটার’। টর নেটওয়ার্কে ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট সংযোগ একাধিক স্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং তথ্য বিভিন্ন রিলের মধ্য দিয়ে যায়।

এর ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত অবস্থান ও আইপি ঠিকানা সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবস্থার তুলনায় বেশি গোপন রাখা সম্ভব হয়। ডার্ক ওয়েবের অনেক ওয়েবসাইটের ঠিকানার শেষে ‘.onion’ থাকে। এ ধরনের ঠিকানা সাধারণ ব্রাউজার বা গুগল সার্চের মাধ্যমে সরাসরি খুঁজে পাওয়া যায় না।

টর ব্যবহার করলেই কি অপরাধ?

না। টর একটি প্রযুক্তি, নিজে কোনো অপরাধ নয়।

অনলাইনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, ট্র্যাকিং কমানো, সেন্সরশিপ এড়িয়ে তথ্য গ্রহণ, সাংবাদিক ও তথ্যদাতার মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ এবং সাইবার নিরাপত্তা গবেষণার মতো বৈধ কাজেও টর ব্যবহার করা হয়।

তবে একই প্রযুক্তিকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব। এ কারণেই ডার্ক ওয়েব ও টর নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।

ডার্ক ওয়েবের বাজার কীভাবে পরিচালিত হয়?

ডার্ক ওয়েবের কিছু মার্কেট দেখতে অনেকটা সাধারণ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মতো। বিক্রেতারা বিভিন্ন পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন দেয়, ক্রেতারা অর্ডার করে এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে লেনদেন সম্পন্ন হয়।

পরিচয় গোপন রাখতে সেখানে ছদ্মনাম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সার্ভারের অবস্থান শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে এসব মার্কেট স্থায়ী নয়। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিযানে ডার্ক ওয়েবের বড় বড় মার্কেট বন্ধ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

তাহলে সিভিগুলো কীভাবে ফাঁস হতে পারে?

তাত্ত্বিকভাবে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত সিভি বিভিন্ন উপায়ে চুরি বা ফাঁস হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে সাইবার হামলা, দুর্বল নিরাপত্তা, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্য ফাঁস কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে সংগ্রহ করা তথ্যকে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ডেটা হিসেবে দাবি করার ঘটনাও ঘটতে পারে।

তাই শুধু ডার্ক ওয়েবের একটি বিজ্ঞাপনে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম থাকার অর্থ এই নয় যে সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই নিশ্চিতভাবে তথ্য চুরি হয়েছে।

বিডিজবস যেখানে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি অস্বীকার করেছে, সেখানে হ্যাকারদের দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকৃত তথ্য ফাঁস হয়েছে কি না, হলে কোন উৎস থেকে হয়েছে এবং বিজ্ঞাপনে থাকা ৬০ লাখ সিভি সত্যিকারের কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত তদন্ত প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা কোথায়?

সিভিতে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ভুল হাতে পড়লে এর অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। ফোন নম্বর, ই-মেইল, ঠিকানা, জন্মতারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মস্থলের তথ্য কিংবা রেফারেন্সের যোগাযোগের তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকরা লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং, স্ক্যাম বা পরিচয়ভিত্তিক প্রতারণার চেষ্টা করতে পারে।

এমনকি চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশ্যে ভুয়া নিয়োগপত্র, চাকরির অফার বা সাক্ষাৎকারের নামে প্রতারণাও করা সম্ভব।

তবে এখন পর্যন্ত ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি সত্যিই চুরি হয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তাই আতঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক থাকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে যাচাই করা তথ্যের অপেক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।








০ টি মন্তব্য



মতামত দিন

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার মতামতটি দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।







পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? পুনরায় রিসেট করুন






রিভিউ

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার রিভিউ দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।