ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ উঠতেই রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোনো অস্ত্র—যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা—আবার সামনে এসেছে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, মোবাইল নেটওয়ার্কে কড়াকড়ি, বিদেশে কল সীমিত—সব মিলিয়ে তথ্যপ্রবাহকে “কন্ট্রোল” করার চেষ্টা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, ঠিক তখনই কেন্দ্রস্থলে উঠে এসেছে এক ভিন্ন ধরনের অবকাঠামো: স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট। এই বাস্তবতায় ইলন মাস্কের স্টারলিংক আর কেবল প্রযুক্তিপণ্য নয়; এটি হয়ে উঠেছে আন্দোলনের তথ্যচিত্র, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ, এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—তিনটি জগতের সংঘর্ষবিন্দু।
“ফ্রি স্টারলিংক”—প্রতীকী সিদ্ধান্ত, বাস্তব প্রভাব
সম্প্রতি স্পেস-এক্স ইরানে স্টারলিংকের ফি কমিয়েছে বা কার্যত বিনামূল্যে উপলভ্য করেছে—এমন দাবি করেছেন বিভিন্ন কর্মী ও পর্যবেক্ষক; তবে কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বিষয়টি স্পষ্ট করেনি বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানি জ্যামিং মোকাবিলায় স্টারলিংক টার্মিনালের সফটওয়্যার/ফার্মওয়্যার আপডেটও দেওয়া হয়েছে—যাতে সিগন্যাল বাধা কিছুটা সামলানো যায়।
এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক অর্থ সহজ: যখন রাষ্ট্র “লাইন কেটে” দেয়, তখন বিকল্প লাইন খুলে দেওয়া হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু বাস্তব প্রভাব নির্ভর করে একাধিক শর্তের ওপর—টার্মিনাল আছে কি না, বিদ্যুৎ আছে কি না, ব্যবহারকারী কতটা ঝুঁকি নিতে পারছেন, এবং সরকার কতটা দক্ষভাবে “ইলেকট্রনিক যুদ্ধ” চালাতে পারে।
স্টারলিংক কেন আলাদা—এবং কেন পুরোপুরি “অজ্যাম্য” নয়
স্টারলিংক নিম্ন-কক্ষপথের (LEO) বহু স্যাটেলাইট দিয়ে কাজ করে; এর ফলে প্রচলিত স্থির-উপগ্রহভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় কভারেজ ও রাউটিং বেশি গতিশীল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ হাজারের মতো দ্রুতগতির LEO স্যাটেলাইটের “বহর” থাকায় সিগন্যাল সম্পূর্ণ বন্ধ করা তুলনামূলক কঠিন—কারণ লক্ষ্যবস্তুও অনেক, পথও বদলায়।
তবে “কঠিন” মানে “অসম্ভব” নয়। ইরান যে কৌশলগুলো ব্যবহার করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসছে, সেগুলো মূলত দুই ধরনের:
• জ্যামিং (Jamming): নির্দিষ্ট এলাকায় শক্তিশালী রেডিও হস্তক্ষেপ তৈরি করে টার্মিনালের সিগন্যাল দুর্বল করা বা বিচ্ছিন্ন করা।
• জিপিএস স্পুফিং (GPS Spoofing): ভুয়া অবস্থান-সংক্রান্ত সিগন্যাল পাঠিয়ে টার্মিনালকে বিভ্রান্ত করা—ফলে সংযোগ থাকে, কিন্তু গতি/স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়।
এক পর্যবেক্ষকের ভাষায়, স্পুফিংয়ের প্রভাবে হয়তো টেক্সট বার্তা আদান-প্রদান সম্ভব হয়, কিন্তু ভারী ডেটা—যেমন ভিডিও কল—ব্যবহার প্রায় অচল হয়ে যায়।
আন্দোলনের ভিডিও, “সত্য” আর স্যাটেলাইট
ব্ল্যাকআউটের বড় লক্ষ্য একটাই: “দৃশ্যমানতা” কমিয়ে দেওয়া—যাতে দমন-পীড়নের মাত্রা, হতাহতের সংখ্যা, এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রমাণ বাইরে না যায়। এখানে স্টারলিংক আন্দোলনকারীদের জন্য কার্যত “আউটলেট”—ভিডিও ও তথ্য পাঠানোর বিকল্প পথ। রয়টার্স বলছে, সহিংসতার ভিডিও বাইরে পাঠাতে স্টারলিংক ব্যবহার হচ্ছে—এবং সরকার টার্মিনাল শনাক্ত/অকার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে এখানেই একটি কঠিন প্রশ্ন: তথ্যপ্রবাহকে মানবাধিকার সুরক্ষার হাতিয়ার বলা যায়, কিন্তু একইসঙ্গে এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা-বয়ানকে উসকে দেয়—কারণ রাষ্ট্র সহজেই “বিদেশি অবকাঠামো”, “গোয়েন্দা সহায়তা” ইত্যাদি শব্দে বিষয়টিকে অপরাধায়িত করতে পারে। ফলে প্রযুক্তি যতটা উদ্ধারকর্তা, ততটাই ঝুঁকির উৎস।
টার্মিনাল কার কাছে—এবং কার ঝুঁকি কতটা
ইরানে স্টারলিংক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত নয়; তবুও বড় সংখ্যায় টার্মিনাল ঢুকেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ইরানের ভেতরে স্টারলিংক টার্মিনালের সংখ্যা নিয়ে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন অনুমান উল্লেখ করা হয়েছে—কিন্তু এটাও বলা হয়েছে যে, ব্যবহারকারী মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই ছোট অংশ।
এখানে “ডিজিটাল বৈষম্য” নতুনভাবে ফিরে আসে:
• কার কাছে ডিভাইস আছে, কার নেই—এটাই ঠিক করে দেয় কে কথা বলতে পারবে।
• যে কথা বলতে পারে, সে-ই বেশি নজরদারি/ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
গার্ডিয়ান আরও বলেছে, কর্তৃপক্ষ ড্রোনসহ নানা উপায়ে ছাদের ওপর থাকা ডিশ/টার্মিনাল খুঁজতে চেষ্টা করছে এবং পুরো পাড়া-এলাকায় জ্যামিং চালাচ্ছে।
আইন-রাজনীতি: “সার্বভৌমত্ব” বনাম “লাইসেন্স ছাড়া সেবা”
সবচেয়ে তীব্র সংঘাতটা কেবল প্রযুক্তির নয়—আইনি ও কূটনৈতিক কাঠামোরও। ইরান বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে তাদের ভূখণ্ডে লাইসেন্স ছাড়া স্টারলিংক টার্মিনাল চলছে। জাতিসংঘের টেলিযোগাযোগ সংস্থা আইটিইউ (ITU)-এর রেডিও রেগুলেশনস বোর্ডের নথিতে দেখা যায়, বোর্ড “অননুমোদিত ট্রান্সমিশন” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নরওয়েকে (নোটিফাইং অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হিসেবে) সক্ষমতার মধ্যে থেকে এসব ট্রান্সমিশন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলেছে—প্রয়োজনে রিমোটলি টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় করার কথাও এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ে দাবি করেছে, অননুমোদিত অপারেশনের যথেষ্ট প্রমাণ তাদের হাতে নেই বা প্রতিটি টার্মিনাল যাচাই বাস্তবে সম্ভব নয়।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন তোলে: বড় কর্পোরেশন কি রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স/সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা করে কার্যত সীমান্ত-উর্ধ্ব অবকাঠামো চালাতে পারে?
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ একদিকে লাইসেন্স-নীতি আছে, অন্যদিকে আছে ইন্টারনেটকে মানবাধিকার হিসেবে দেখার নৈতিক দাবি—আর মাঝখানে আটকে যায় বাস্তব মানুষ ও তাদের নিরাপত্তা।
কঠোর শাস্তির বার্তা: প্রযুক্তিকে অপরাধায়িত করা
যে মুহূর্তে কোনো প্রযুক্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যায়, রাষ্ট্র প্রায়শই প্রযুক্তিটিকে “অপরাধ” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইরানে স্টারলিংক সংক্রান্ত শাস্তি কঠোর হওয়ার কথা এসেছে—গার্ডিয়ানের ভাষায়, টার্মিনাল রাখা “গুপ্তচরবৃত্তি” হিসেবে ব্যাখ্যাত হতে পারে এবং বহু বছরের কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইরানওয়্যার-এর প্রতিবেদনে খসড়া/আইনগত ব্যবস্থার ধারাগুলোতে “অননুমোদিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ডিভাইস” ব্যবহার/ধারণের জন্য কারাদণ্ড ও বাজেয়াপ্তকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে আবার দ্বিধা: শাস্তির ভয় যত বাড়ে, ব্যবহারকারী তত কমে; কিন্তু যারা ব্যবহার করে, তাদের ঝুঁকি তত বেড়ে যায়—ফলে তথ্যপ্রবাহ টিকে থাকলেও তা হয় “সংকুচিত” ও “বিপজ্জনক”।
ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চ: যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ইরান—এবং বাজার
রয়টার্স বলেছে, স্টারলিংক কীভাবে এই চাপ সামলায়, তা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মহল, মিত্র দেশ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও নজর রাখছে; কারণ এটি ভবিষ্যৎ সংঘাতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ভূমিকা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেবে। একই সঙ্গে স্পেস-এক্সের বাজারমুখী পরিকল্পনা থাকলে বিনিয়োগকারীরাও “রেজিলিয়েন্স টেস্ট” হিসেবে দেখবে—কোম্পানি যুদ্ধক্ষেত্রসদৃশ পরিবেশে সেবা ধরে রাখতে পারে কি না।
এখানে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা হলো: মানুষের যোগাযোগের অধিকার একটি বেসরকারি কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং সিদ্ধান্ত, আপডেট-চক্র, এবং ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এটা ভবিষ্যতে নীতি-প্রশ্নকে আরও জটিল করবে।
সামনে কী—“কারিগরি যুদ্ধ” দীর্ঘ হলে কী বদলাবে
ইরান-স্টারলিংক দ্বন্দ্ব দেখাচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্র শুধু রাস্তায় নয়—স্পেকট্রাম, জিপিএস, এবং সিগন্যাল-স্তরেও যুদ্ধ করে। এবং এই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিবর্তন সামনে আসে:
- ব্ল্যাকআউটের কার্যকারিতা কমতে পারে, কারণ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বিকল্প পথ দেয়—সম্পূর্ণ বন্ধ করা কঠিন।
- রিপ্রেশনের “টেকনিক্যালাইজেশন” বাড়তে পারে—টার্মিনাল শিকার, স্পুফিং, লোকাল জ্যামিং, আইনগত অপরাধায়ন—সবই আরও প্রাতিষ্ঠানিক হবে।
- আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো টানাপোড়েনে পড়বে—আইটিইউর মতো ফোরামে “লাইসেন্স বনাম মানবাধিকার” বিতর্ক ঘনীভূত হবে।
শেষ কথা: স্টারলিংক ইরানের আন্দোলনে “ম্যাজিক বুলেট” নয়—কারণ ঝুঁকি, অসমতা, এবং জ্যামিং-স্পুফিং বাস্তব। কিন্তু এটি এক নতুন যুগের সংকেত—যেখানে তথ্যচাপা দিতে চাইলে রাষ্ট্রকে শুধু সুইচ বন্ধ করলেই হয় না; তাকে মোকাবিলা করতে হয় আকাশের দিক থেকেও আসা নেটওয়ার্ককে। আর সেই লড়াইয়ে জিতবে কে—তা নির্ধারণ করবে প্রযুক্তি নয় শুধু, রাজনীতি, আইন, আন্তর্জাতিক বিধি, এবং মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতাও।
এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গণতন্ত্র বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাম্বাসেডর











০ টি মন্তব্য