বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তরের গল্প এখন খুব জোরে বলা হয়। সেবা অনলাইনে যাচ্ছে, ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে, সরকারি দপ্তর প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, সংসদও নিজস্ব কিছু কার্যক্রম ডিজিটাল করেছে। সব মিলিয়ে এক ধরনের অগ্রগতির ছবি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই ছবির ভেতরে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়ে গেছে: ডিজিটাল অগ্রযাত্রা কি সত্যিই সবার জন্য? নাকি এটি মূলত তাদের জন্য, যারা আগে থেকেই তুলনামূলকভাবে এগিয়ে?
এই প্রশ্নটি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ডিজিটাল উন্নয়ন শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়। এটি সমানভাবে আইন, অধিকার, প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়। আর এখানেই সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব তথ্যসমাজ সম্মেলন বা WSIS এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো দেয়। এর মূল দর্শন খুব পরিষ্কার: প্রযুক্তি এমন একটি তথ্যসমাজ গড়ে তুলবে, যা মানুষকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নমুখী। অর্থাৎ, ডিজিটাল রূপান্তর মানে কেবল প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে তথ্য, জ্ঞান, দক্ষতা, সেবা এবং সুযোগ সমাজের সব স্তরে পৌঁছাবে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, এই লক্ষ্য কে বাস্তবায়ন করবে? শুধু মন্ত্রণালয়? শুধু প্রযুক্তিবিদ? শুধু দাতা সংস্থা? না। শেষ পর্যন্ত আইন, বাজেট, তদারকি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির জায়গাটি সংসদই নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল উন্নয়ন নিয়ে আমরা প্রায়ই পরিসংখ্যানের সাফল্যে মুগ্ধ হই। কিন্তু পরিসংখ্যান সব সত্য বলে না। শহর ও গ্রামের বাস্তবতা এক নয়। নারী ও পুরুষের ডিজিটাল সক্ষমতা এক নয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণের জন্য অনলাইন সেবা সুবিধা হতে পারে, কিন্তু একজন গ্রামীণ নারী, একজন প্রবীণ নাগরিক, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা কম আয়সম্পন্ন পরিবারের কারও জন্য একই সেবা অনেক সময় অগম্য, দুর্বোধ্য বা অকার্যকর। ফলে ডিজিটাল অবকাঠামো বাড়লেই যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন হবে, এমন মনে করা আসলে বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা।
এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ডিজিটাল নীতিকে আমরা অনেক সময় কেবল প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত প্রকল্প হিসেবে দেখি। যেন এটি মূলত একটি মন্ত্রণালয়, কিছু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আর কিছু কর্পোরেট অংশীদারের কাজ। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমস্যাজনক। কারণ ডিজিটাল রূপান্তর ক্ষমতার প্রশ্নও। কে প্রবেশাধিকার পাবে, কার তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হবে, কারা বাদ পড়বে, কে অনলাইনে নিরাপদ থাকবে, কার কণ্ঠ দৃশ্যমান হবে, আর কারা অদৃশ্য থেকে যাবে, এগুলো সবই রাজনৈতিক প্রশ্ন। আর রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাবদিহির কেন্দ্র হলো সংসদ।
সংসদ সদস্যদের ভূমিকা এখানে কয়েকটি জায়গায় বিশেষভাবে জরুরি।
প্রথমত, আইন প্রণয়ন। ডিজিটাল অধিকার, তথ্য সুরক্ষা, অনলাইন নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার, স্থানীয় ভাষার ডিজিটাল কনটেন্ট, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার, এসবই এখন আইন ও নীতির প্রশ্ন। এগুলোকে প্রযুক্তিগত সুবিধার বিষয় হিসেবে ছেড়ে দিলে চলবে না। সংসদকে এখানে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাজেট। ডিজিটাল উন্নয়ন মানে বড় বড় প্রকল্পের উদ্বোধন নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সরকারি বরাদ্দ কি গ্রামীণ সংযোগ, স্কুলভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষা, কম আয়ের মানুষের সক্ষমতা, নারী প্রশিক্ষণ, প্রতিবন্ধীবান্ধব সেবা এবং স্থানীয় উদ্ভাবনে পৌঁছাচ্ছে? সংসদ যদি এই প্রশ্ন না তোলে, তাহলে ডিজিটাল উন্নয়ন এলিটমুখী হয়েই থাকবে।
তৃতীয়ত, তদারকি। সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলো যদি সক্রিয় না হয়, তবে ডিজিটাল নীতির বড় অংশই কাগজে সুন্দর দেখাবে, কিন্তু বাস্তবে ঘাটতি থেকে যাবে। সরকারি ডিজিটাল সেবা কতটা কার্যকর, সাইবার ঝুঁকি কতটা বাড়ছে, তথ্য-সুরক্ষার অবস্থা কী, অনলাইন হয়রানি বা ডিজিটাল বৈষম্য কীভাবে বাড়ছে, এগুলো সংসদীয় পর্যালোচনার বিষয় হওয়া উচিত। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব বলে ভেবে বসলে ভুল হবে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ, নারী ও শিশু, জনপ্রশাসন, তথ্য ও সম্প্রচার, সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল নীতির প্রভাব আছে।
চতুর্থত, প্রতিনিধিত্ব। সংসদ সদস্যদের বড় শক্তি হলো তাঁরা মানুষের বাস্তব জীবনকে নীতির আলোচনায় তুলতে পারেন। ঢাকা শহরের ডিজিটাল অভিজ্ঞতা আর একটি উপকূলীয় উপজেলার অভিজ্ঞতা এক নয়। একজন প্রযুক্তি-সচেতন নাগরিক আর একজন প্রথম-প্রজন্মের ডিজিটাল ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এক নয়। সংসদ যদি এই বৈচিত্র্যকে নীতিতে অনুবাদ করতে না পারে, তাহলে ডিজিটাল রূপান্তর উপরমহলের ভাষা হয়েই থাকবে।
এখানে আরেকটি বিভ্রান্তি ভাঙা জরুরি। সংসদে কিছু ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হয়েছে মানেই এই নয় যে সংসদ ডিজিটাল নীতিনির্ধারণে প্রস্তুত। প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন আর রাজনৈতিক সক্ষমতা এক নয়। সংসদ অনলাইনে নথি চালাচালি করতে পারে, কিন্তু তবুও AI, platform accountability, misinformation, data governance বা digital inclusion-এর মতো প্রশ্নে নীরব থাকতে পারে। তাই প্রকৃত প্রয়োজন হলো সংসদ সদস্যদের জ্ঞানভিত্তিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো।
WSIS প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক আলাপ নয়। এটি একটি আয়না। এই আয়না আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে: আমরা কি প্রযুক্তিকে উন্নয়নের হাতিয়ার করছি, নাকি বৈষম্যের নতুন অবকাঠামো তৈরি করছি? আমরা কি ডিজিটাল সেবাকে নাগরিকবান্ধব করছি, নাকি নাগরিককে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বাধ্য করছি? আমরা কি অন্তর্ভুক্তির ভাষা বলছি, নাকি বাস্তবে একটি নতুন ডিজিটাল শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করছি?
বাংলাদেশ যদি সত্যিই “সবার জন্য ডিজিটাল উন্নয়ন” চায়, তাহলে সংসদ সদস্যদের আরও সক্রিয়, দক্ষ এবং দৃশ্যমান ভূমিকা নিতে হবে। তাঁদের জন্য নিয়মিত ব্রিফিং, নীতি-আলোচনা, বিশেষজ্ঞ সংলাপ, কমিটি-ভিত্তিক শুনানি, এবং ডিজিটাল অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান জরুরি। শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া যথেষ্ট নয়; দেশে ফিরে এসে সেই আলোচনাকে আইন, বাজেট, নীতি এবং জবাবদিহিতে রূপ দিতে হবে।
শেষ কথা সহজ। ডিজিটাল ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ প্রযুক্তি পথ দেখাতে পারে, কিন্তু পথটি ন্যায়সঙ্গত হবে কি না, তা নির্ধারণ করে রাজনীতি। আর সেই রাজনীতির সাংবিধানিক কেন্দ্রগুলোর একটি হলো সংসদ। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশকে সত্যিই সবার বাংলাদেশ করতে চাইলে সংসদকে প্রান্তে নয়, কেন্দ্রেই আনতে হবে।
জেনেভায় ২০২৬ সালের ৬ থেকে ১০ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব তথ্যসমাজ সম্মেলন (WSIS) ফোরাম ২০২৬-এর প্রাক্কালে, বহুপক্ষীয় অংশীজনভিত্তিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই নিবন্ধটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক, বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর








০ টি মন্তব্য