https://powerinai.com/

সাম্প্রতিক খবর

জুলাইয়ে জেনেভায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা: বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কেন জরুরি

জুলাইয়ে জেনেভায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা: বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কেন জরুরি জুলাইয়ে জেনেভায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা: বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কেন জরুরি
 

জুলাই মাসে জেনেভা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শাসন নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত প্রথম Global Dialogue on AI Governance, AI for Good Global Summit এবং WSIS Forum—এই তিনটি আয়োজন একই সময়ে জেনেভায় অনুষ্ঠিত হবে। এটি শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়; এটি এআই যুগে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, মানবাধিকার, উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা এখন আর কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আর্থিক সেবা, প্রশাসন, শ্রমবাজার, গণমাধ্যম, নির্বাচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে তরুণ জনগোষ্ঠী বড়, ডিজিটাল সেবা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে, আর অর্থনীতি রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল—সেখানে এআইকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এআই কি বাংলাদেশের জন্য শুধু সুযোগ, নাকি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে? উত্তর হলো—দুটিই। এআই কৃষককে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য দিতে পারে, রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে, শিক্ষার্থীর জন্য ব্যক্তিগত শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহায়ক প্রযুক্তি দিতে পারে, সরকারি সেবা সহজ করতে পারে, বাংলা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল জ্ঞানভান্ডার তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এআই কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি করতে পারে, ভুল তথ্য ছড়াতে পারে, নজরদারি বাড়াতে পারে, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার ঘটাতে পারে, অ্যালগরিদমিক বৈষম্য তৈরি করতে পারে এবং বাংলা ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তির বাজারে প্রান্তিক করে দিতে পারে।

এই বাস্তবতায় জেনেভার আলোচনায় বাংলাদেশের উপস্থিতি জরুরি, কারণ বৈশ্বিক এআই শাসনের নিয়ম এখন তৈরি হচ্ছে। যারা আলোচনার টেবিলে থাকবে, তারাই ভবিষ্যতের নীতির ভাষা, অগ্রাধিকার ও মানদণ্ড প্রভাবিত করতে পারবে। বাংলাদেশ যদি শুধু পরে তৈরি হওয়া নিয়ম মেনে চলার অবস্থানে থাকে, তবে তার জাতীয় বাস্তবতা, বাংলা ভাষা, স্থানীয় জ্ঞান, শ্রমবাজার, উন্নয়ন-চাহিদা ও মানবাধিকার উদ্বেগ বৈশ্বিক নীতিতে যথেষ্ট জায়গা নাও পেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রথম দাবি হওয়া উচিত—এআই শাসন যেন কেবল উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশগুলোর এজেন্ডা না হয়। এআইয়ের সুবিধা যারা তৈরি করছে, তাদের মতো যারা এর প্রভাব ভোগ করবে, তাদেরও মতামত সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে বলতে হবে, এআই বিভাজন যেন নতুন ডিজিটাল বৈষম্যে পরিণত না হয়। ইন্টারনেট সংযোগ, ডেটা অবকাঠামো, দক্ষতা, ভাষা, গবেষণা, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং নীতিগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতা আলাদা। তাই বৈশ্বিক সহযোগিতা দরকার শুধু নীতিকথায় নয়, অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহযোগিতা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে বাংলা ভাষা ও স্থানীয় জ্ঞানের প্রশ্ন তুলতে হবে। বিশ্বে এআই মডেলগুলোর বড় অংশ ইংরেজি ও কয়েকটি প্রভাবশালী ভাষাকেন্দ্রিক। বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা হলেও এআই উন্নয়নে এর মানসম্মত ডেটা, ভাষা-সম্পদ, করপাস, বক্তৃতা-ডেটা, আঞ্চলিক ভাষা, লোকজ জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান যথাযথভাবে সংগঠিত নয়। ফলে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এআই যুগে ব্যবহারকারী হিসেবে থাকবে, কিন্তু জ্ঞান-উৎপাদক হিসেবে পিছিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের উচিত জেনেভায় বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই, স্থানীয় ভাষা প্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভাষাগত ন্যায়বিচারকে বৈশ্বিক আলোচনায় তুলে ধরা।

তৃতীয়ত, মানবাধিকার ও মানব তদারকির প্রশ্ন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গোপনীয়তা, ডেটা সুরক্ষা, বৈষম্য প্রতিরোধ এবং মানুষের শেষ সিদ্ধান্তের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেই এআই নিরাপদ হয় না; এর জন্য প্রয়োজন আইন, নীতি, স্বাধীন তদারকি, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং প্রতিকারব্যবস্থা। বাংলাদেশ যদি সরকারি সেবা, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষায় এআই ব্যবহার করতে চায়, তবে “মানুষের ওপর প্রযুক্তি” নয়; “মানুষের জন্য প্রযুক্তি”—এই নীতিকে কেন্দ্রীয় করতে হবে।

চতুর্থত, এআই এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বাংলাদেশের বিশেষ অবস্থান আছে। তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, আউটসোর্সিং, গণমাধ্যম, শিক্ষা, কাস্টমার সার্ভিস, অনুবাদ, ডিজাইন, কনটেন্ট তৈরি ও প্রশাসনিক কাজের অনেক ক্ষেত্রে অটোমেশন প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে নতুন কাজও তৈরি হবে—ডেটা অ্যানোটেশন, এআই সিস্টেম ব্যবস্থাপনা, লোকাল কনটেন্ট উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, এআই-সহায়ক গবেষণা, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, শিক্ষা প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি। তাই বাংলাদেশকে এআইকে কর্মসংস্থান ধ্বংসের আতঙ্ক হিসেবে নয়, দক্ষতা রূপান্তরের এজেন্ডা হিসেবে দেখতে হবে। জেনেভায় বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত—Global South-এর তরুণদের জন্য এআই দক্ষতা, ন্যায্য ডিজিটাল শ্রমনীতি এবং ভবিষ্যৎ কাজের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হতে হবে।

পঞ্চমত, এআই বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, বন্যা, নগর জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু অভিবাসনের ঝুঁকিতে আছে। এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাস, স্যাটেলাইট ডেটা, ঝুঁকি মানচিত্র, কৃষি পরামর্শ, দুর্যোগ সতর্কতা এবং স্থানীয় ভাষায় সতর্কবার্তা জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু এসব প্রযুক্তি যেন শুধু প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে; কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ বৈশ্বিক মঞ্চে তুলে ধরতে পারে।

ষষ্ঠত, তথ্য-অখণ্ডতা ও গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ এআই আলোচনার কেন্দ্র হওয়া দরকার। ডিপফেক, ভুয়া ছবি, এআই-নির্মিত অপপ্রচার, নির্বাচনী বিভ্রান্তি, নারীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল সহিংসতা, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সামাজিক অস্থিরতা—এসব ঝুঁকি বাংলাদেশে বাস্তব। সাংবাদিকতা, ফ্যাক্ট-চেকিং, মিডিয়া লিটারেসি এবং প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহিকে এআই শাসনের সঙ্গে যুক্ত না করলে গণতান্ত্রিক পরিসর দুর্বল হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও প্রযুক্তি সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

সপ্তমত, বাংলাদেশকে এআই শাসনে বহুপক্ষীয় পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। সরকার একা এআই শাসন করতে পারবে না। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ICT Division, Ministry of Foreign Affairs, BTRC, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, প্রযুক্তি কোম্পানি, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, নারী সংগঠন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন, যুবসমাজ, শিশু অধিকারকর্মী এবং প্রযুক্তি সম্প্রদায়কে। জেনেভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলও হওয়া উচিত বহুপক্ষীয়—শুধু আমলাতান্ত্রিক নয়, জ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি “Bangladesh Observatory on Digital Cooperation, Internet Governance and AI Governance” গঠনের উদ্যোগ বিবেচনা করতে পারে। এই অবজারভেটরি WSIS Action Lines, Internet Governance processes, Global Digital Compact, Pact for the Future এবং UN Global Dialogue on AI Governance-এর সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিগত অগ্রগতি, অংশগ্রহণ, গবেষণা ও ফলোআপ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এতে বৈশ্বিক অঙ্গীকার ও দেশীয় বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হবে।

বাংলাদেশের আরও একটি জরুরি করণীয় হলো একটি সুস্পষ্ট জাতীয় এআই অবস্থানপত্র তৈরি করা। সেখানে থাকতে হবে—মানবাধিকারভিত্তিক এআই, বাংলা ভাষা ও স্থানীয় জ্ঞান, ডেটা সুরক্ষা, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান রূপান্তর, শিক্ষা ও দক্ষতা, কৃষি ও জলবায়ু, স্বাস্থ্য, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, সাইবার নিরাপত্তা, গবেষণা অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অগ্রাধিকার। জেনেভার মতো বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশ যদি প্রস্তুত অবস্থান নিয়ে যায়, তবে তার কণ্ঠ আরও কার্যকর হবে।

জুলাইয়ের জেনেভা তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ। এটি কেবল অংশগ্রহণের সুযোগ নয়; নেতৃত্বের সুযোগ। বাংলাদেশ বিশ্বকে বলতে পারে, এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু শক্তিশালী প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এটি মানুষের, ভাষার, সংস্কৃতির, উন্নয়নের, অধিকারের এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। বাংলাদেশ বলতে পারে, Global South শুধু এআই বাজার নয়; Global South-ও জ্ঞান উৎপাদন করে, অভিজ্ঞতা তৈরি করে, সমাধান দেয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সহজ: এআই যুগে বাংলাদেশ কি শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা থাকবে, নাকি ন্যায্য, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই শাসনের সক্রিয় নির্মাতা হবে? জেনেভার বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এই উত্তর নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বাংলাদেশের উচিত সেখানে যাওয়া—শুধু উপস্থিতি জানানোর জন্য নয়, নিজের অভিজ্ঞতা, দাবি, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ দর্শন স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য। কারণ এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আলোচনা আজ শুরু হচ্ছে, তা আগামী দিনের শিক্ষা, কাজ, অধিকার, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের কাঠামো নির্ধারণ করবে। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশের কণ্ঠ অবশ্যই থাকতে হবে।

লেখক পরিচিতিঃ

এ এইচ এম বজলুর রহমান

ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ

দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর








০ টি মন্তব্য



মতামত দিন

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার মতামতটি দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।







পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? পুনরায় রিসেট করুন






রিভিউ

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার রিভিউ দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।