https://powerinai.com/

সাম্প্রতিক খবর

সাইবার নিরাপত্তায় ডিজিটাল সেফ সিস্টেম পদ্ধতি: মানুষ ভুল করবে, দায়িত্বশীল ব্যবস্থা সেই ভুলকে বিপর্যয়ে পরিণত হতে দেবে না

সাইবার নিরাপত্তায় ডিজিটাল সেফ সিস্টেম পদ্ধতি:  মানুষ ভুল করবে, দায়িত্বশীল ব্যবস্থা সেই ভুলকে বিপর্যয়ে পরিণত হতে দেবে না সাইবার নিরাপত্তায় ডিজিটাল সেফ সিস্টেম পদ্ধতি: মানুষ ভুল করবে, দায়িত্বশীল ব্যবস্থা সেই ভুলকে বিপর্যয়ে পরিণত হতে দেবে না
 

বিশ্ব তথ্যসমাজ শীর্ষ সম্মেলন বা WSIS বহু আগেই তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহারে আস্থা ও নিরাপত্তাকে তথ্যসমাজের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম কণ্ঠ, ভুয়া পরিচয় ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল নির্ভরতার এই সময়ে প্রশ্নটি আরও কঠিন: আমরা কি শুধু মানুষকে অনলাইনে যুক্ত করছি, নাকি এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ছি, যেখানে মানুষের ভুলের পরও তাকে রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে?

লিখেছেন: এ এইচ এম বজলুর রহমান

দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর এবং WSIS Forum 2026-এর উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণকারী। জেনেভা, সুইজারল্যান্ড থেকে।

ধরুন, আমরা একটি নতুন রাস্তা তৈরি করলাম।

রাস্তা চকচকে। দ্রুতগতির গাড়ি ছুটছে। নতুন প্রযুক্তির যানবাহন নামছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেই রাস্তা ব্যবহার করছেন।

কিন্তু কার্যকর সিগন্যাল নেই। গতিনিয়ন্ত্রণ দুর্বল। যানবাহনের নিরাপত্তামান ঠিকমতো যাচাই করা হয় না। পথচারী পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা নেই।

তারপর দুর্ঘটনা ঘটল।

আমরা আহত পথচারীর দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রশ্ন করলাম, “আপনি আরও সতর্ক হলেন না কেন?”

প্রশ্নটি পরিচিত শোনায়।

কারণ ডিজিটাল পৃথিবীতে আমরা প্রায় প্রতিদিনই ঠিক এই কাজটি করছি।

কারও ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা চলে গেছে।

“লিংকে ক্লিক করলেন কেন?”

কারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দখল হয়েছে।

“পাসওয়ার্ড শক্ত ছিল না কেন?”

একজন প্রবীণ মানুষ পরিচিত কণ্ঠে জরুরি অর্থের আবেদন বিশ্বাস করেছেন।

“যাচাই করলেন না কেন?”

একজন নারীর ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিকৃত করা হয়েছে।

“ছবি অনলাইনে দিয়েছিলেন কেন?”

প্রশ্নগুলো সব সময় অপ্রাসঙ্গিক নয়। নাগরিকের দায়িত্ব অবশ্যই আছে। কিন্তু আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আলোচনায় একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে: ডিজিটাল ব্যবস্থার দুর্বলতার দায় আমরা খুব সহজে ব্যবহারকারীর ভুলে নামিয়ে আনছি।

তাই এখন অন্য একটি প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।

মানুষ ভুল করবে ধরে নিয়ে আমরা কি ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করছি?

সড়ক নিরাপত্তা থেকে ডিজিটাল পৃথিবীর শিক্ষা

আধুনিক সড়ক নিরাপত্তার সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করে: মানুষ ভুল করবে এবং মানবদেহের আঘাত সহ্য করার সীমা আছে। তাই পরিবহনব্যবস্থাকে এমনভাবে নকশা করতে হবে, যাতে মানবিক ভুলকে যতটা সম্ভব সামলে নেওয়া যায় এবং সেই ভুল মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতে পরিণত না হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেফ সিস্টেমকে ব্যবহারকারীর প্রয়োজনের প্রতি সাড়া দেওয়া এবং মানবিক ভুলকে সহনশীলভাবে গ্রহণ করতে সক্ষম পরিবহনব্যবস্থার ধারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। 

এই দর্শনে সড়ক নিরাপত্তা শুধু চালকের দায়িত্ব নয়।

আইন আছে।

সিগন্যাল আছে।

নিরাপদ সড়ক নকশা আছে।

যানবাহনের নিরাপত্তামান আছে।

গতিসীমা আছে।

চালকের প্রশিক্ষণ আছে।

পথচারীর দায়িত্বও আছে।

দুর্ঘটনা ঘটলে জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থা থাকার কথা।

একটি স্তর ব্যর্থ হলে অন্য স্তরগুলো মানুষের জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসবে। এটিই সেফ সিস্টেমের শক্তি।

ডিজিটাল পৃথিবী কেন ভিন্ন হবে?

আমি এখানে ‘ডিজিটাল সেফ সিস্টেম’ কথাটি WSIS-এর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করছি না। বরং সড়ক নিরাপত্তার সেফ সিস্টেম দর্শন থেকে নেওয়া একটি নীতিগত উপমা ও প্রস্তাব হিসেবে ব্যবহার করছি।

এর মূল ধারণা সহজ:

মানুষ ডিজিটাল জগতে ভুল করবে। কিন্তু একটি সাধারণ মানবিক ভুল যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আর্থিক ধ্বংস, সামাজিক অপমান, পরিচয় হারানো কিংবা স্থায়ী ক্ষতির কারণ না হয়।

ব্যবহারকারীর দায়িত্ব আছে, কিন্তু তিনি একা নন

অবশ্যই নাগরিকের দায়িত্ব আছে।

অপরিচিত বা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা প্রয়োজন।

অস্বাভাবিক অর্থের অনুরোধ যাচাই করা জরুরি।

শক্তিশালী এবং আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত।

দুই ধাপের যাচাইকরণ চালু রাখা দরকার।

ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।

কিন্তু এখানেই আলোচনা শেষ হলে সমস্যাটি শুরু হয়।

একজন মানুষ ভুল করে একটি লিংকে ক্লিক করলেন। প্রশ্ন হলো, সেই একটি ক্লিকের পর তাঁর ব্যাংক হিসাবের সব অর্থ চলে যাওয়ার সুযোগ কেন থাকবে?

একজন প্রবীণ গ্রাহক জীবনে কখনো রাত দুইটায় বড় অঙ্কের টাকা অপরিচিত হিসাবে পাঠাননি। হঠাৎ এমন লেনদেন হচ্ছে। শুধু একটি OTP সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে বলেই কি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ?

একজন নারীর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছে। কেউ সেই ছবি ব্যবহার করে AI-সহায়তায় যৌনভাবে বিকৃত কনটেন্ট তৈরি করল। প্রশ্ন কি হবে, “আপনি ছবি দিয়েছিলেন কেন?”

নাকি প্রশ্ন হবে, প্ল্যাটফর্ম কত দ্রুত ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করেছে? অভিযোগ জানানো কতটা সহজ ছিল? কনটেন্ট সরাতে কত সময় লেগেছে? প্রমাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল কি? আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিষয়টি বুঝেছে কি?

ডিজিটাল সেফ সিস্টেমের প্রথম নীতি হওয়া উচিত: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের আগে ব্যবস্থাকে জিজ্ঞাসা করুন।

ব্যবহারকারী কী ভুল করেছেন?

তার পাশাপাশি জিজ্ঞেস করুন:

তাঁর ভুলের পরও তাঁকে রক্ষার জন্য ব্যবস্থাটি কী করেছিল?

WSIS আস্থাকে অনেক আগেই কেন্দ্রে রেখেছিল

এই প্রশ্ন আসলে নতুন নয়।

২০০৩ সালের জেনেভা প্ল্যান অব অ্যাকশনে WSIS Action Line C5-এর শিরোনাম ছিল, “Building confidence and security in the use of ICTs”। সেখানে আস্থা ও নিরাপত্তাকে তথ্যসমাজের প্রধান স্তম্ভগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সরকার ও অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতা, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ ও মোকাবিলা, ব্যবহারকারীর শিক্ষা, গোপনীয়তা, ভোক্তা সুরক্ষা, দ্রুত ঘটনা মোকাবিলা এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য অনলাইন প্রয়োগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। 

দুই দশকেরও বেশি সময় পরে ‘confidence’ শব্দটির গুরুত্ব হয়তো আরও গভীরভাবে বোঝা যাচ্ছে।

WSIS Forum 2026 জেনেভায় ৬ থেকে ১০ জুলাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি WSIS+20 জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ পর্যালোচনার পর প্রথম WSIS Forum। 

এবারের Leaders TalkX আলোচনার একটি শিরোনাম “Cyber Confidence: Enhancing Security in the Digital Age”। WSIS-এর সরকারি কর্মসূচি আস্থাকে ডিজিটাল সমাজের ‘অদৃশ্য অবকাঠামো’ হিসেবে দেখছে এবং নিরাপদ, সুরক্ষিত ও অধিকারসম্মত প্রযুক্তির সঙ্গে ন্যায়সংগত ডিজিটাল রূপান্তরের সম্পর্ক সামনে আনছে। 

এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আকর্ষণীয় শিরোনাম নয়।

এটি তথ্যসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন।

গত দুই দশকে আমরা সংযোগ বাড়িয়েছি।

ইন্টারনেট অবকাঠামো তৈরি করেছি।

মোবাইল সংযোগ বিস্তৃত করেছি।

ডিজিটাল আর্থিক সেবা চালু করেছি।

সরকারি সেবা অনলাইনে নিয়েছি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের প্রকাশের নতুন জায়গা তৈরি করেছে।

এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রশাসন, সাংবাদিকতা ও ব্যবসার ভেতরে দ্রুত প্রবেশ করছে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন তুলতে হবে:

সংযোগ যে গতিতে বেড়েছে, আস্থা কি সেই গতিতে বেড়েছে?

পরবর্তী ডিজিটাল বিভাজন হয়তো নিরাপত্তার সক্ষমতায়

ডিজিটাল বিভাজন বলতে আমরা দীর্ঘদিন বুঝেছি, কে ইন্টারনেটে যুক্ত আর কে যুক্ত নয়।

সেই বিভাজন এখনো বাস্তব।

কিন্তু আরেকটি বিভাজন তৈরি হচ্ছে।

দুজনের হাতে একই স্মার্টফোন থাকতে পারে।

একই মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারেন।

একই ডিজিটাল সেবায় প্রবেশ করতে পারেন।

তবু তাঁদের নিরাপদ থাকার সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

একজন সন্দেহজনক বার্তার ভাষা বুঝতে পারেন।

অন্যজন পারেন না।

একজন অনলাইন হয়রানির স্ক্রিনশট, URL ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করতে জানেন।

অন্যজন আতঙ্কে সব মুছে ফেলেন।

একটি বড় প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা দল আছে।

একটি কমিউনিটি রেডিওতে হয়তো একজন কর্মী একই সঙ্গে স্টেশনের ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শ্রোতার তথ্য এবং অফিসের কম্পিউটার সামলাচ্ছেন।

একটি বড় ব্যাংক উন্নত প্রতারণা শনাক্তকরণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে।

একটি ছোট নাগরিক সংগঠনের কয়েকজন কর্মী হয়তো এখনো একটি পাসওয়ার্ড ভাগ করে ব্যবহার করছেন।

তাহলে কি শুধু সংযোগের সংখ্যা দিয়ে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি মাপা যথেষ্ট?

না।

সংযুক্ত হওয়া আর নিরাপদে সংযুক্ত থাকা এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে আমরা এমন একটি তথ্যসমাজ তৈরি করব, যেখানে প্রযুক্তিগতভাবে সবার দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু নিরাপদে থাকার সুবিধা প্রধানত প্রযুক্তিদক্ষ, শিক্ষিত এবং সম্পদশালী মানুষের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

তখন ডিজিটাল বৈষম্য কমবে না।

শুধু তার পোশাক বদলাবে।

AI প্রতারণা তৈরি করেনি, তার শিল্পায়ন সহজ করছে

প্রতারণা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবিষ্কার নয়।

মানুষ বহু আগে থেকেই অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে।

গুজব, ছদ্মবেশ, প্রতারণা ও মিথ্যা বহু পুরোনো।

কিন্তু AI প্রতারণার তিনটি বিষয় বদলে দিতে পারে: গতি, পরিমাণ ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

আগে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণামূলক বার্তা তৈরি করতে সময় লাগত।

এখন অল্প সময়ে বহু ব্যক্তিকেন্দ্রিক বার্তা তৈরি করা সম্ভব।

আগে কারও কণ্ঠ বিশ্বাসযোগ্যভাবে নকল করা কঠিন ছিল।

এখন কৃত্রিম কণ্ঠ, পরিবর্তিত ছবি ও সিনথেটিক কনটেন্ট সাধারণ মানুষের জন্য সত্য-মিথ্যা আলাদা করার কাজকে আরও কঠিন করে তুলছে।

একটি পরিচিত মুখ।

একটি পরিচিত কণ্ঠ।

একটি পরিচিত সম্বোধন।

“মা, খুব বিপদে আছি।”

“ভাই, এখনই টাকা পাঠাও।”

“স্যার, ফাইলটি একটু দেখে দেবেন?”

প্রতারণা এখন বিশ্বাসের ভাষায় কথা বলতে পারে।

এখানেই পুরোনো সাইবার সচেতনতার মডেল প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আমরা বহু বছর ধরে নাগরিককে বলেছি, “দেখে বুঝুন এটি ভুয়া কি না।”

AI-যুগে সব সময় কি দেখে বোঝা সম্ভব হবে?

হয়তো না।

তাহলে কি নাগরিককে শুধু আরও প্রশিক্ষণ দিলেই হবে?

না।

কারণ দক্ষতা প্রয়োজন, কিন্তু দক্ষতা নিরাপত্তাব্যবস্থার বিকল্প নয়।

সড়ক নিরাপত্তায় আমরা চালককে প্রশিক্ষণ দিই। তাই বলে সিগন্যাল তুলে দিই না।

পথচারীকে সতর্ক করি। তাই বলে নিরাপদ পারাপারের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না।

ঠিক একইভাবে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে, কিন্তু সেই অজুহাতে নিরাপদ প্রযুক্তি নকশার দায়িত্ব কমানো যাবে না।

‘ডিজিটাল সেফ সিস্টেম’ দেখতে কেমন হতে পারে

প্রথমত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে মানুষের ভুল ঘটবে ধরে নিয়ে নকশা করতে হবে।

একটি অ্যাকাউন্টের আচরণ হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বদলে গেলে অতিরিক্ত যাচাই সক্রিয় হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শুধু সঠিক PIN বা OTP দেখলেই লেনদেনের দায়িত্ব শেষ হয়েছে ভাবলে চলবে না। অস্বাভাবিক অর্থের পরিমাণ, সময়, নতুন প্রাপক বা আচরণের বড় পরিবর্তন ঝুঁকির সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি কোম্পানিকে নিরাপত্তাকে ঐচ্ছিক অতিরিক্ত সুবিধা নয়, ডিফল্ট নকশার অংশ করতে হবে।

সবচেয়ে নিরাপদ সেটিং খুঁজতে সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল গোলকধাঁধায় ঢুকতে হবে কেন?

চতুর্থত, অভিযোগ ও প্রতিকারব্যবস্থা হতে হবে সহজ।

একজন নারী প্রযুক্তিসহায়ক সহিংসতার শিকার হলে তাঁকে প্রথমে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের দরজায় ঘুরে বুঝতে হবে না, অভিযোগটি কার এখতিয়ারে পড়ে।

পঞ্চমত, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে ডিজিটাল প্রমাণ, সিনথেটিক মিডিয়া, অনলাইন পরিচয় নকল এবং প্রযুক্তিসহায়ক ক্ষতির নতুন ধরন বুঝতে হবে।

ষষ্ঠত, সাংবাদিকদের কৃত্রিম কনটেন্ট যাচাই, উৎস সুরক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তাকে সাংবাদিকতার মৌলিক দক্ষতা হিসেবে দেখতে হবে।

সপ্তমত, বিদ্যালয়ে শুধু কম্পিউটার চালানো শেখানো যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীকে ডিজিটাল যাচাই, সম্মতি, গোপনীয়তা এবং অনলাইন ক্ষতির ক্ষেত্রে কী করতে হবে, তা শেখাতে হবে।

এবং সবশেষে, একটি স্তর ব্যর্থ হলে অন্য স্তরকে সক্রিয় হতে হবে।

এটাই ডিজিটাল সেফ সিস্টেমের মূল দর্শন হতে পারে।

সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিকে দিয়ে নিরাপত্তার মান বিচার করুন

ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রায়ই একজন ‘আদর্শ ব্যবহারকারী’ কল্পনা করে।

তিনি শিক্ষিত।

প্রযুক্তিদক্ষ।

গোপনীয়তা নীতিমালা পড়েন।

দুই ধাপের যাচাইকরণ বোঝেন।

ফিশিং লিংক চিনতে পারেন।

অ্যাপের নিরাপত্তা সেটিং পরীক্ষা করেন।

কিন্তু বাস্তব তথ্যসমাজ এমন মানুষে পূর্ণ নয়।

এখানে প্রথমবার ইন্টারনেট ব্যবহার করা মানুষ আছেন।

প্রবীণ নাগরিক আছেন।

শিশু আছে।

সীমিত সাক্ষরতার মানুষ আছেন।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন।

গ্রামীণ নারী আছেন, যাঁর নিজের ডিভাইসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও হয়তো নেই।

বিদেশে কাজ করা অভিবাসী শ্রমিক আছেন, যিনি অপরিচিত ভাষায় কোনো আর্থিক বা সরকারি সেবা ব্যবহার করছেন।

ছোট ব্যবসায়ী আছেন।

স্থানীয় সাংবাদিক আছেন।

কমিউনিটি মিডিয়া আছে।

তাঁরা তথ্যসমাজের প্রান্ত নন।

তাঁরাই তথ্যসমাজ।

তাই সাইবার নিরাপত্তায় প্রশ্নটি শুধু হওয়া উচিত নয়, “আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান ডিজিটাল সম্পদ কোনটি?”

আরও একটি প্রশ্ন করুন:

আমাদের সবচেয়ে কম সুরক্ষিত ডিজিটাল অংশগ্রহণকারী কে?

একটি ব্যবস্থা কতটা উন্নত, তা সবচেয়ে দক্ষ ব্যবহারকারী দিয়ে বিচার করলে ভুল হতে পারে।

দেখুন, সবচেয়ে কম দক্ষ মানুষটি সেখানে কতটা নিরাপদ।

স্থানীয় ভাষাও সাইবার নিরাপত্তার অবকাঠামো

একজন গ্রামের মানুষ হয়তো জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশল পড়বেন না।

একজন প্রবীণ নারী প্রযুক্তি কোম্পানির ইংরেজি নিরাপত্তা নির্দেশিকা বুঝবেন না।

কিন্তু তিনি কমিউনিটি রেডিও শুনতে পারেন।

স্থানীয় সাংবাদিকের কথা বিশ্বাস করতে পারেন।

নারী সংগঠনের কর্মীর কাছে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারেন।

WSIS-এর মানুষকেন্দ্রিক ও বহু অংশীজনভিত্তিক দর্শনের বাস্তব পরীক্ষা এখানেই। Geneva Plan of Action নিজেই সরকার, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতা, ব্যবহারকারীর শিক্ষা এবং পারস্পরিকভাবে শক্তিশালী নিরাপত্তা উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছিল। 

কিন্তু মাল্টিস্টেকহোল্ডার অংশগ্রহণ শুধু সম্মেলনের মঞ্চে সবার জন্য চেয়ার রাখার নাম নয়।

এটি মানুষের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।

কমিউনিটি রেডিওতে নিয়মিত ডিজিটাল নিরাপত্তা অনুষ্ঠান হতে পারে।

বাংলা ও স্থানীয় ভাষায় চলমান প্রতারণার ধরন ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

একজন নারী জানতে পারেন, হয়রানির প্রমাণ কীভাবে সংরক্ষণ করবেন।

একজন প্রবীণ মানুষ একটি সাধারণ নিয়ম শিখতে পারেন: পরিচিত কেউ ডিজিটালে জরুরি টাকা চাইলে আগের পরিচিত নম্বরে ফোন করে যাচাই করুন।

একজন সাংবাদিক সন্দেহজনক ভিডিও প্রকাশের আগে যাচাইয়ের ধাপ জানতে পারেন।

এগুলো অত্যাধুনিক সাইবার প্রকৌশল নয়।

কিন্তু এগুলো অর্থ, মর্যাদা এবং কখনো জীবন রক্ষা করতে পারে।

WSIS-এর জন্য এখন প্রশ্ন: নিরাপদ ব্যবস্থা কে তৈরি করবে?

WSIS Forum 2026-এর সরকারি কর্মসূচিতে আস্থা, নিরাপদ প্রযুক্তি ও অধিকারসম্মত ডিজিটাল রূপান্তরের সম্পর্ক সরাসরি সামনে এসেছে। 

তাই এখন শুধু নাগরিককে বলা যথেষ্ট নয়, “আরও সতর্ক হোন।”

রাষ্ট্রকে জিজ্ঞেস করতে হবে: প্রতিকারব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

প্রযুক্তি কোম্পানিকে জিজ্ঞেস করতে হবে: নিরাপত্তা ডিফল্ট নয় কেন?

আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জিজ্ঞেস করতে হবে: অস্বাভাবিক লেনদেন থামানোর ব্যবস্থা কোথায়?

শিক্ষাব্যবস্থাকে জিজ্ঞেস করতে হবে: ডিজিটাল যাচাই কি মৌলিক দক্ষতা হিসেবে শেখানো হচ্ছে?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জিজ্ঞেস করতে হবে: প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষতি বুঝতে সক্ষমতা আছে কি?

সংবাদমাধ্যমকে জিজ্ঞেস করতে হবে: ভয় ছড়ানোর বাইরে নাগরিককে ব্যবহারিক তথ্য দেওয়া হচ্ছে কি?

নাগরিক সমাজকেও জিজ্ঞেস করতে হবে: আমরা কি শুধু নীতির ভাষায় কথা বলছি, নাকি সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপত্তার জ্ঞান পৌঁছে দিচ্ছি?

সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ আমাদের একটি শক্তিশালী শিক্ষা দেয়।

মানুষের ভুল অনিবার্য। কিন্তু সেই ভুলকে ভয়াবহ ক্ষতিতে পরিণত হতে দেওয়া অনিবার্য নয়।

ডিজিটাল সমাজেও এখন একই মানসিকতা প্রয়োজন।

মানুষ ভুল লিংকে ক্লিক করবে।

কখনো কৃত্রিম কণ্ঠ বিশ্বাস করবে।

ভুল ব্যক্তিকে তথ্য পাঠাবে।

প্রতারণার ভাষায় বিভ্রান্ত হবে।

তাই বলে একটি মাত্র ভুলের মূল্য কি হবে জীবনের সঞ্চয়?

সম্মান?

পরিচয়?

নিরাপত্তা?

না।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা মানুষকে ডিজিটাল পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলেছি। WSIS-এর মূল দৃষ্টিভঙ্গিও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী তথ্যসমাজ নির্মাণের কথা বলে। 

এখন আরও কঠিন কাজটি করতে হবে।

এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা মানুষের ভুলকে স্বীকার করে, ক্ষতির আগে প্রতিরোধ করে, ক্ষতি হলে দ্রুত সাড়া দেয় এবং ভুক্তভোগীকে একা ফেলে রাখে না।

এটাই আমি ‘ডিজিটাল সেফ সিস্টেম’ বলতে চাই।

আমরা ডিজিটাল রাস্তা তৈরি করেছি।

মানুষ সেখানে উঠেছে।

AI সেই রাস্তায় আরও দ্রুতগতির যান নামাচ্ছে।

এখন সিগন্যাল, গতিনিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তামান, জরুরি সেবা এবং যৌথ দায়িত্বের ব্যবস্থা গড়ে তোলার সময়।

কারণ একটি সত্য সড়ক ও সাইবার জগত উভয়ের জন্যই সমান:

মানুষ ভুল করবে। একটি দায়িত্বশীল ব্যবস্থা সেই ভুলকে বিপর্যয়ে পরিণত হতে দেবে না।








০ টি মন্তব্য



মতামত দিন

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার মতামতটি দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।







পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন? পুনরায় রিসেট করুন






রিভিউ

আপনি লগ ইন অবস্থায় নেই।
আপনার রিভিউ দেওয়ার জন্য লগ ইন করুন। যদি রেজিষ্ট্রেশন করা না থাকে প্রথমে রেজিষ্ট্রেশন করুন।