দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগও জরুরি বলে মনে করছেন প্রকৌশলীরা। বিশেষ করে স্মার্ট গ্রিড, এনার্জি স্টোরেজ, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি খাতকে আরও দক্ষ ও টেকসই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) সদর দপ্তরে আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘Energy Security in Bangladesh: Understanding the Challenges and Shaping the Way Forward’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে আইইবির ইয়াং ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টার।
জ্বালানি সংকটে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের তাগিদ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য।
দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া, আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
স্মার্ট গ্রিড ও এআইতে বাড়তে পারে দক্ষতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে স্মার্ট গ্রিড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর সঙ্গে এনার্জি স্টোরেজ, আইওটি, এআই ও ডিজিটাল মনিটরিং প্রযুক্তি যুক্ত হলে বিদ্যুতের ব্যবহার ও সরবরাহের বিভিন্ন স্তরে অপচয় কমানো সম্ভব।
শিল্প ও পরিবহন খাতেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে সেমিনারে মত দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের নেতৃত্বে এসব ব্যবস্থা পরিচালনার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অদক্ষ ব্যবহারেও বাড়ছে জ্বালানি সংকট
আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ বলেন, জ্বালানি সংকটের পেছনে শুধু সরবরাহের ঘাটতিই দায়ী নয়; অদক্ষ ব্যবহার ও পরিকল্পনাগত অপচয়ও বড় কারণ।
গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পদগুলোতে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়া স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিচালন ব্যয় এবং আর্থিক প্রভাব পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকারিতা যাচাইয়ের দাবি
সেমিনারে অতীতে স্থাপিত বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয়, পরিচালন সক্ষমতা ও আর্থিক প্রভাব নিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
যেসব প্রকল্পে অনিয়ম বা অপচয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হবে, সেসব ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।
সুপারিশ যাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে
আইইবির ভারপ্রাপ্ত সম্মানী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল জানান, সেমিনারে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সুপারিশমালা তৈরি করা হবে। জাতীয় জ্বালানি নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এসব সুপারিশ বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে আইইবি দেশের বিভিন্ন কেন্দ্র, উপকেন্দ্র, ওভারসিজ চ্যাপ্টার, প্রকৌশল বিভাগ ও বোর্ডের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নবায়নযোগ্য শক্তিতেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের একদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
এর পাশাপাশি আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদকে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে অপচয় কমিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে প্রযুক্তি, দক্ষ প্রকৌশলী এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের ওপরই এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।









০ টি মন্তব্য